04/05/2026
চিকিৎসায় অবহেলা বনাম হাসপাতালে ভাঙচুর: আইন কী বলে? ⛔
প্রিয়জনের অসুস্থতা বা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু যেকোনো পরিবারের জন্যই এক চরম আবেগের ও বেদনার মুহূর্ত। অনেক সময়ই অভিযোগ ওঠে চিকিৎসকের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার। কিন্তু এই শোক ও ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে হাসপাতালে ভাঙচুর করা বা চিকিৎসকের ওপর হামলা করা কি কোনো সমাধান? এতে কি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়, নাকি ভুক্তভোগী পরিবার উল্টো আইনি গ্যাঁড়াকলে পড়ে যায়?
চলুন জেনে নিই এই বিষয়ে আমাদের দেশের প্রচলিত আইন কী বলে।
চিকিৎসকের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসায় রোগীর ক্ষতি হলে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে সুনির্দিষ্ট আইনি পথে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে:
বিএমডিসি (BMDC)-তে অভিযোগ: বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (BMDC) চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ করা যায়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিএমডিসি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন বা প্র্যাকটিসের লাইসেন্স নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত বা স্থায়ীভাবে বাতিল করতে পারে।
ফৌজদারি মামলা / Criminal Case: দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারা অনুযায়ী, অবহেলাজনিত কারণে কারো মৃত্যু ঘটালে তা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর জন্য থানায় এজাহার দায়ের করা যায় অথবা সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর (CR) মামলা করা যায়। দোষ প্রমাণিত হলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।
ক্ষতিপূরণ চেয়ে দেওয়ানি মামলা / Civil Suit: ভুল চিকিৎসার কারণে রোগীর শারীরিক, মানসিক বা আর্থিকভাবে যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য দেওয়ানি আদালতে ‘টর্ট (Tort)’ আইনের অধীনে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ (Damages) চেয়ে মামলা করার অধিকার ভুক্তভোগী পরিবারের রয়েছে। যদিও টর্টের মামলা বাংলাদেশে হয়না বললেই চলে!
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ: প্রাইভেট ক্লিনিক বা হাসপাতালে প্রতিশ্রুত সেবার ঘাটতি বা প্রতারণার শিকার হলে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’-এর অধীনে অভিযোগ করা যায়।
আবেগের বশবর্তী হয়ে হাসপাতালে ভাঙচুর ও হামলার আইনি পরিণতিঃ
প্রিয়জন হারানোর কষ্ট যতই তীব্র হোক না কেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। হাসপাতালে হামলা করলে ভুক্তভোগী পরিবার নিজেদের আইনি অবস্থান তো দুর্বল করেই, উপরন্তু নিজেরাও অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হয়।
হাসপাতাল সরকারি হোক বা বেসরকারি, সেখানে ভাঙচুর করা দণ্ডবিধির ৪২৭ ধারা অনুযায়ী একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করলে আরও কঠোর আইনের সম্মুখীন হতে হয়।
চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর শারীরিক আঘাত করলে দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩২৪ বা ৩২৬ ধারায় (আঘাতের ধরন অনুযায়ী) মামলা হতে পারে। গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে এটি জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
দলবদ্ধ হয়ে হাসপাতালে হামলা চালালে দণ্ডবিধির ১৪৩ ও ১৪৭ ধারায় বেআইনি সমাবেশ ও দাঙ্গার অভিযোগে মামলা দায়ের হতে পারে।
নিজেদের ভুল ঢাকতে বা আইনি সুবিধা পেতে অনেক সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভাঙচুরের ঘটনাকে পুঁজি করে উল্টো রোগীর স্বজনদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের চাঁদাবাজি বা লুটপাটের মিথ্যা মামলাও দিয়ে থাকে।
ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার সবার আছে। ভুল চিকিৎসা হলে আবেগে ভেসে গিয়ে ভাঙচুর করবেন না; এতে আসল অপরাধ ঢাকা পড়ে যায় এবং আপনি নিজেই অপরাধী হয়ে যান। সঠিক তথ্য ও প্রমাণ (প্রেসক্রিপশন, টেস্ট রিপোর্ট, বিলের কপি) সংগ্রহ করুন এবং আইনি পথে লড়াই করুন।
আইন জানুন, আইনি পথে চলুন। সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পোস্টটি শেয়ার করতে পারেন!