06/02/2026
জাতীয় নির্বাচন; জনগণের মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব!
জাতীয় নির্বাচন গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি ও জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। এমনকি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জাতীয় নির্বাচন জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। নির্বাচন মানে জনগণের স্বাধীন মত প্রকাশ, শাসক নির্বাচন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতা নিশ্চিত করা। নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশের পরবর্তী সরকার বা কর্ণধার নির্ধারিত হয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশও এর থেকে ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু বাংলাদেশের অতীত ও বর্তমান বাস্তবতা হলো নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে নির্বাচনের পূর্বেই জনগণের মাঝে মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব তৈরি করতে বিভিন্ন মহল কাজ করে।
অতীতে আমরা দেখেছি নির্বাচনের পূর্বে দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও গোটা মিডিয়া হাুউজ আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিস্ট হাসিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকত। দেশের ইন্ডাস্ট্রি হাউজগুলো তৎকালীন সরকারি দলের দলীয় প্রচারণায় তাদের অর্থ ব্যয় করত। এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ২২শে জুলাই ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিয়ে তার পাশে থাকার ঘোষণা দেন। (সুত্র: https://da.gd/V9CTPj)।
অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা এই অবস্থার পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পুণরায় সেই রূপ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ, বিজনেসম্যান এবং তথাকথিত সুশীল সমাজকে এখনই বিএনপির প্রতি ঝুঁকে পড়তে দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই শীর্ষ ব্যবসায়ীরা তারেক রহমানের সাথে বৈঠক করেছে। (সুত্র: https://da.gd/Nr6oFm)। এভাবেই তারা জনগণের মনে আগামীর সরকারের একটি রূপ দেখা দাঁড় করিয়ে জনগণের মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব তৈরি করে।
সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের দর্পণ। যা সরকারের অন্যায় বা ভুলগুলো তুলে ধরার মধ্য দিয়ে সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সহায়তা করবে। কিন্তু আমাদের সংবাদ মাধ্যমগুলো সরকারের অন্যায়-অপকর্ম তুলে ধরার চেয়ে সেগুলোর জাস্টিফিকেশন করতে বেশি ব্যস্ত। এমনকি ফ্যাসিবাদী সরকারের শাসন ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে তারা নির্বাচনের সময় ফ্যাসিবাদী সরকারের পক্ষে বয়ান নির্মাণ করতো।
নির্বাচনের পূর্বে বিভিন্ন প্রোপাগাণ্ডা ও তথাকথিত জরিপের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়। রাষ্ট্রীয় ও দলীয় নিয়ন্ত্রণাধীন গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত জরিপ এবং একপাক্ষিক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে জনগণের মনে দু-একটি দলকে ক্ষমতায় যাওয়ার কাছাকাছি প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। ফলত, জনগণ নিজের প্রকৃৃত মতপ্রকাশে অক্ষম হয়ে পড়ে। গত কিছুদিন থেকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে একইভাবে বিভিন্ন জরিপ ও প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো হচ্ছে। যা আগামী নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে বলে প্রতীয়মান হয়।
এছাড়াও বিশ্লেষণ বলছে, এদেশের মানুষ নতুনত্বকে চাইতে পারে না, পুরোনো শাসনব্যবস্থাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। এ যেন লাশটা এখনো খুনিকেই ভালোবাসে—প্রবাদের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বিদেশী কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ নেতা নির্বাচনে সর্বদাই অসৎ ক্ষমতাশালী ও অধিক অর্থবিত্তের মালিক এমন মানুষকে বেছে নেন। যে মানুষের হাতে গুন্ডাবাহিনি আছে ভয়ে হোক বা ঝামেলা এড়াতে হোক—ভোটটা তাকেই দেয়। ফলে নির্বাচিত শাসক কম শোষক হয়ে ওঠে বেশী। অথচ ইসলাম এবং নির্বাচনের মূল লক্ষ্য পুরোপুরি ভিন্ন।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক বিষয় হলো জনগণ কর্তৃক মনোনীত হয়ে কোন দল ক্ষমতায় আরোহন করবে এবং জনগণের কল্যাণেই তারা কাজ করবে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো যারা ক্ষমতায় আরোহন করে তারা জনগণের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় আসলেও জনগণের কল্যাণের চেয়ে নিজেদের কল্যাণ চিন্তায় অধিক ব্যস্ত থাকে। কেননা, এখানে ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের ভোটের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে না।
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক ইভেন্ট নয়; এটি জনগণের রাজনৈতিক চেতনার প্রতিচ্ছবি। যখন নির্বাচন জনগণকে ক্ষমতাবান করার বদলে ভয়, হতাশা ও নিরুপায়ত্ব শেখায়, তখন তা মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বে রূপ নেয়। এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শক্তিশালী বিরোধী রাজনীতি এবং সর্বোপরি জনগণের নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন ও সাহসী হয়ে ওঠা। কারণ প্রকৃত মুক্তি আসে কেবল মানসিক স্বাধীনতার মধ্য দিয়েই।
নতুন বাংলাদেশে সময় এসেছে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা। অতএব জনতার উচিত, সকল মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব বর্জন করে নিজের প্রকৃত মতামত ব্যক্ত করা।
আসুন, একটি সুন্দর ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে আগামী নির্বাচনে মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বের বাহিরে গিয়ে, ভয়ডর কিংবা প্রভাব প্রতিপত্তিকে দূরে সরিয়ে রেখে সততা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমকে প্রাধান্য দিয়ে আপনার মূল্যবান ভোট প্রদান করুন।