14/03/2026
সংসদ; ইসলামপন্থীদের উত্থান নাকি পতনের সুর?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থী ধারার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, লিগ্যাসী রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন উত্থান–পতন, নিষেধাজ্ঞা, পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ইসলামপন্থী দলগুলো নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও পরবর্তী সাংসদ অধিবেশনকে ঘিরে যে বাস্তবতা, শূন্যতা ও আফসোস তৈরি হয়েছে, তা ইসলামপন্থী রাজনীতির জন্য এক গভীর আত্মসমালোচনার মুহূর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি হওয়া সত্ত্বেও সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে না পারা কেবল একটি নির্বাচনী ব্যর্থতা নয়। বরং এটি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ইসলামপন্থীদের অবস্থান, পথচলা, জাগরণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রথমত, রাজনৈতিক বাস্তবতায় সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগাতে না পারা একটি বড় কৌশলগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার দ্বিমুখী প্রতিযোগিতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির জন্য একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই শূন্যতার জায়গায় ইসলামপন্থী দলগুলোর জন্য জনসমর্থন গড়ে তোলার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সাংগঠনিক দুর্বলতা, পারস্পরিক বিভাজন এবং কার্যকর নির্বাচনী কৌশলের অভাবে সেই সম্ভাবনাকে শক্তিশালী রাজনৈতিক উপস্থিতিতে রূপ দেওয়া যায়নি।
দ্বিতীয়ত, ইসলামপন্থী রাজনীতির ভেতরে ঐক্যের অভাব একটি বড় সংকট হিসেবে সামনে এসেছে। বিভিন্ন দল, সংগঠন এবং নেতৃত্বের মধ্যে মতাদর্শিক ও কৌশলগত বিভক্তি প্রায়ই সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। ফলে জনগণের সামনে একটি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেখানে জোট ও সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে ইসলামপন্থীদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি তাদের সম্ভাবনাকে সীমিত করেছে। এবছর তো সেই শূন্যতা পূরণের স্বপ্ন আশা দেখিয়েও আমাদের কে এই জোট হতাশ করেছে। প্রতারণা, অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা, কূটচাল, ষড়যন্ত্র ও কমন শত্রুর পাতা ফাঁদে পা দিয়ে সেই স্বপ্নে হানা দিয়ে সবাইকে ব্যাথাতুর করেছে।
তৃতীয়ত, নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রশাসনিক, ডিপস্টেটের রাজনৈতিক বাধা, প্রভাব এবং ষড়যন্ত্রের প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে। এবং এটা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ও মোস্ট ওপেন সিক্রেট। বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে যে বিতর্ক ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তা ছোট বা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির জন্য একটি কঠিন পরিবেশ তৈরি করে। তবে বাস্তবতা হলো শুধু বাহ্যিক বাধাকে দায়ী করে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে হলে সংগঠন, জনসম্পৃক্ততা এবং বাস্তবধর্মী কৌশল এই তিনটি ক্ষেত্রেই দৃঢ়তা প্রয়োজন। ইসলামপন্থীদের এই তিনটাই সবচেয়ে বড় সংকট। এগুলো কাটাতে হবে।
চতুর্থত, নতুন প্রজন্মের কাছে ইসলামপন্থী রাজনীতির ভাষা ও কর্মসূচিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আজকের তরুণ সমাজ শুধু আবেগ বা স্লোগানের রাজনীতি নয়, বরং সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালার প্রত্যাশা করে। ইসলামপন্থী দলগুলো যদি তাদের রাজনৈতিক দর্শনকে সমসাময়িক বাস্তবতার সাথে যুক্ত করে উপস্থাপন করতে না পারে, তবে তাদের প্রভাব সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রথম সংসদ অধিবেশনে ইসলামপন্থীদের অনুপস্থিতি কেবল একটি সংসদীয় শূন্যতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তাও বটে। রাজনীতিতে সুযোগ সবসময় আসে না, আর যখন আসে তখন তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব পড়ে। তাই ইসলামপন্থী রাজনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে আত্মসমালোচনা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং বৃহত্তর জাতীয় রাজনীতির সাথে বাস্তবসম্মত সংযোগ তৈরি করা, কৌশল ও নতুন কর্মপন্থা তৈরি করা।
সবশেষে বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি ইসলামপন্থী রাজনীতির জন্য একদিকে যেমন সংকটের ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে তেমনি নতুনভাবে নিজেদেরকে পুনর্গঠনেরও সুযোগ তৈরি করে। যদি তারা এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঐক্য, কৌশল এবং জনগণের পালস বুঝে বাস্তব সমস্যার সমাধানকে কেন্দ্র করে রাজনীতি গড়ে তুলতে পারে, তবে ভবিষ্যতে আবারও শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যথায়, এই ব্যর্থতা হয়তো সত্যিই ইসলামপন্থী রাজনীতির জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি অশনি সংকেত হয়ে থাকবে। শুধু তাই নয় এই ধারার রাজনীতির অপমৃত্যুও হতে পারে বলে আশঙ্কার অবকাশ আছে।
—সাইফ সিদ্দিকী,
বিশ্লেষক, ন্যারেটিভ টিম