21/08/2026
আপনি কি কখনো কাউকে বিশ্বাস করে একটি ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করে দিয়েছিলেন?
#ব্যবসায়িক লেনদেন, ঋণের নিশ্চয়তা কিংবা নিছক বিশ্বাসের জায়গা থেকে অনেকেই ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করে দেন। পরবর্তীতে সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ চেকের গায়ে নিজের ইচ্ছামতো টাকার অংক, তারিখ বা প্রাপকের নাম বসিয়ে আদালতে দ্য নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় মামলা করে বসেন। ফলে নিরপরাধ মানুষও ফেঁসে যান দীর্ঘ মামলার জালে।
তবে সুখবর হলো—মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ এমন হয়রানির বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, যা ভুক্তভোগীদের জন্য একটি বড় ঢাল হয়ে উঠতে পারে।
একটি চেকে সাধারণত থাকে স্বাক্ষর, তারিখ, প্রাপকের নাম আর টাকার অংক (সংখ্যায় ও কথায়)। বাস্তবে দেখা যায়, চেকের স্বাক্ষরটি হয়তো আসামির নিজের, কিন্তু ভেতরের অন্য লেখাগুলো—তারিখ, নাম কিংবা টাকার অংক—সম্পূর্ণ ভিন্ন হাতের লেখা এবং ভিন্ন কালিতে করা। অর্থাৎ চেকটি আসামি নিজে পূরণ করেননি, করেছেন অন্য কেউ। এখানেই আসে এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য (৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭) মামলার গুরুত্ব। হাইকোর্ট বিভাগ এই মামলায় স্পষ্ট করে বলেছেন—
চেক দাতা (ড্রয়ার) নিজে সম্পূর্ণ চেকটি না লিখলে এবং অন্য কেউ পরে অংক, তারিখ বা নাম বসিয়ে দিলে, আর সেখানে হাতের লেখায় স্পষ্ট গরমিল থাকলে, মামলার প্রাথমিক অনুমান ভেঙে যায়।
সহজ কথায়—শুধু স্বাক্ষর মিললেই মামলা টিকবে, এমন ভাবার সুযোগ নেই। বাকি লেখাগুলোর সঙ্গে অসংগতি থাকলে গোটা মামলার ভিত্তিই নড়ে যেতে পারে।
দ্য নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ৮৭ ধারায় বলা আছে, চেকদাতার সম্মতি বা স্বাক্ষর ছাড়া যদি চেকের মূল বিষয়বস্তুতে—যেমন টাকার অংকে—কোনো পরিবর্তন বা সংযোজন করা হয়, যা চেকের মূল চরিত্র বদলে দেয়, তাহলে সেই চেকটি আইনি দৃষ্টিতে বাতিল বলে গণ্য হয়। আইনের ভাষায় একে বলে "বস্তুগত পরিবর্তন" বা Material Alteration।
অর্থাৎ, কেউ যদি ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে পরে নিজের সুবিধামতো অংক বসিয়ে দেন, সেই চেক দিয়ে ফৌজদারি মামলা চালানোর আইনগত ভিত্তি থাকে না।
সাধারণত ১৩৮ ধারার মামলায় আদালত প্রাথমিকভাবে ধরে নেয় যে, চেকটি বৈধ দেনা পরিশোধের জন্যই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যখনই আসামি হাতের লেখায় অসংগতি বা চেকে কাটাকাটি-ঘষামাজার প্রমাণ দেখাতে পারেন, তখন প্রমাণের দায়িত্ব ঘুরে যায় বাদীর ঘাড়ে।
চেকটি কেন আসামি নিজে পূরণ করেননি? তাহলে চেকের ভেতরের লেখাগুলো কার হাতে লেখা? অন্য কেউ চেক পূরণ করলে তার জন্য আসামির সুনির্দিষ্ট অনুমতি ছিল কি না? এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে মামলার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞ বা ফরেনসিক প্রতিবেদনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চেকের ভেতরের লেখা ও কালিতে যদি ফরেনসিক পরীক্ষায় গরমিল ধরা পড়ে, তা মামলার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিতে পারে।
তবে মনে রাখা জরুরি, ফরেনসিক রিপোর্টই একমাত্র নির্ধারক নয়—আদালত সামগ্রিক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
যারা এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন বা পড়তে পারেন, তাদের জন্য কিছু সতর্কতা ও করণীয়।
কখনোই সম্পূর্ণ ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করবেন না। প্রয়োজনে টাকার অংক ও তারিখ নিজ হাতে লিখে দিন। মামলায় জড়ালে আইনজীবীর মাধ্যমে হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞের মতামত (ফরেনসিক পরীক্ষা) চেয়ে আবেদন করুন।
জেরার সময় বাদীকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করুন—চেকের ভেতরের লেখা কার হাতে, চেকটি কি আপনার সামনে পূরণ হয়েছিল? প্রয়োজনে পাল্টা ব্যবস্থা নিন। অনুমতি ছাড়া চেকে পরিবর্তন প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় জালিয়াতির মামলা করার সুযোগও থাকে।
চেক-সংক্রান্ত মামলা মানেই আসামির দোষী হওয়া নয়। হাতের লেখার অসংগতি, বস্তুগত পরিবর্তন এবং ফরেনসিক প্রমাণ একটি মামলাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে পারে। ৭৫ ডিএলআর ৪৪৭ নজিরটি এই বিষয়ে ভুক্তভোগীদের জন্য একটি শক্তিশালী আইনগত হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
তবে প্রতিটি মামলার তথ্য-প্রমাণ ভিন্ন হয়, তাই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
লেখক: seraj.pramanik