21/05/2026
May it please your Lordship(s): হাইকোর্ট বিভাগের নতুন আইনজীবীদের জন্য টুকিটাকিr
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে প্রাকটিসের অনুমতিপ্রাপ্ত নতুন আইনজীবীদের অভিনন্দন। জজ কোর্ট থেকে হাইকোর্ট বিভাগের কাজের ধরন, পরিবেশ এবং শিষ্টাচার অনেকটাই ভিন্ন। প্রথম দিকে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগলেও কিছু মৌলিক আইনি পরিভাষা ও কার্যপদ্ধতি জানা থাকলে পথচলা অনেক সহজ হয়ে যায়।
নতুন আইনজীবীদের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ "টুকিটাকি" বিষয় নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
১। মেইডেন অ্যাপিয়ারেন্স (Maiden Appearance) কী এবং এর গুরুত্ব
হাইকোর্ট বিভাগে অনুমতি পাওয়ার পর একজন নতুন আইনজীবী হিসেবে মাননীয় আদালতের সামনে প্রথমবার দাঁড়িয়ে নিজের নাম এবং মামলার পক্ষ সমর্থন করে উপস্থিত হওয়ার ঘটনাকে “মেইডেন অ্যাপিয়ারেন্স” (প্রথম উপস্থিতি) বলা হয়। এটি একজন আইনজীবীর পেশাগত জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
কীভাবে করতে হয়: সাধারণত নিজের মামলার শুনানির শুরুতে বা সিনিয়র কোনো মামলা মুভ করার সময় আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজের নাম রেকর্ড করাতে হয়।
আদালতের শিষ্টাচার: প্রথমবার দাঁড়ানোর সময় বিনীতভাবে বলতে হয়: *"May it please your Lordship(s), this is my maiden appearance before your Lordship(s) ..."* সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতিরা সাধারণত নতুনদের মেইডেন অ্যাপিয়ারেন্সকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে নেন, অনেক সময় অভিনন্দন জানান এবং সাবমিশনে ছোটখাটো ভুল হলে তা স্নেহের সাথে শুধরে দেন। এমনকি জটিল মামলাকেও রিলিফ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
২। মেনশন (Mention) কী এবং মেনশনে মূলত কী থাকে?
হাইকোর্ট বিভাগে কোনো জরুরি মামলা দ্রুত শুনানির জন্য কজলিস্টে (Cause List) অন্তর্ভুক্ত করতে বা কজলিস্টের নিচে থাকা মামলা ওপরে আনার জন্য অথবা মামলা এক্সটেনশন, ফিক্স করতে, পিটিশন জমা দিতে, ফটোকপি কাগজ দিয়ে এফিডেভিট করতে পারমিশন নেওয়া, ইত্যাদি মাননীয় আদালতের কাছে যে মৌখিক আবেদন করা হয়, তাকে ‘মেনশন করা’ বলে।
মেনশনে মূলত যা থাকে: মেনশন করার সময় একটি নির্দিষ্ট স্লিপ (Mention Slip) ব্যবহার করতে হয়। এতে মামলার ধরন (যেমন- Writ/Civil/Criminal), মামলার নম্বর, সাল, পক্ষগণের নাম এবং কজলিস্টের বর্তমান সিরিয়াল নম্বর (যদি থাকে) উল্লেখ থাকে।
কীভাবে মেনশন করতে হয়: প্রতিদিন কোর্ট বসার পর প্রথম ১৫-৩০ মিনিট মেনশন নেওয়ার নির্ধারিত সময়। স্লিপটি সংশ্লিষ্ট কোর্টের বেঞ্চ অফিসারের (Bench Officer) মাধ্যমে মাননীয় বিচারপতির ডেস্কে পাঠাতে হয়। এরপর সিরিয়াল এলে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে বলতে হয়: “May it please your Lordship, I have a mention matter for listing/fixing a date..."
৩। পাস ওভার (Pass Over) এবং নট টুডে (Not Today)
কোর্টে প্রাকটিস করতে গেলে এই দুটি শব্দ প্রতিদিন শতবার শুনতে হবে। এগুলো কীভাবে এবং কখন চাইতে হয় তা জানা অত্যন্ত জরুরি:
পাস ওভার (Pass Over): কজলিস্টে আপনার মামলার সিরিয়াল চলে এসেছে, কিন্তু আপনার সিনিয়র অন্য কোর্টে ব্যস্ত আছেন অথবা আপনি প্রস্তুতির জন্য সামান্য সময় চান—তখন আদালতের কাছে 'পাস ওভার' চাইতে হয়। এটা প্রয়োজনে কোর্ট উঠার সময়ও করা যেতে পারে।
কীভাবে নিতে হয়: বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে বলুন, “May it please your Lordship(s), I on behalf of my learned senior pray for pass over(আইটেম কল করাপ সময়) আদালত সদয় হলে মামলাটি সাময়িকভাবে বাদ রেখে তালিকার শেষে বা পরে শুনানির জন্য রাখেন। যদি কোর্ট উঠার সময় করেন তাহলে May it please your Lordship(s), I beg to mention item number….on behalf of my learned senior pray for pass over.
নট টুডে (Not Today): যদি কোনো কারণে (যেমন—প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট এখনো হাতে আসেনি বা অন্য যে কোন যৌক্তিক কারন) মামলাটি ওই নির্দিষ্ট দিনে শুনানি করতে না চান, তবে 'নট টুডে'র আবেদন করতে হয়।
কীভাবে নিতে হয়: অপর পক্ষের আইনজীবীকে (যদি উপস্থিত থাকেন) আগে জানিয়ে আদালতে বলতে হয়, *"May it please your Lordship, I on behalfof my learned senior pray for 'Not Today'." আদালত অনুমতি দিলে ওই দিনের জন্য মামলাটি কজলিস্ট থেকে বাদ যায়।
৪। ফটোকপি পারমিশন (Photocopy Permission)
অনেক সময় মামলার মূল নথি বা সার্টিফাইড কপি (Certified Copy) তুলতে সময় লাগে, কিন্তু জরুরি শুনানির জন্য নথির ফটোকপি ব্যবহার করা প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি নিতে হয়।
কীভাবে নিতে হয়: সরাসরি পিটিশন নিয়ে কোর্টে হাজির হয়ে মৌখিকভাবে মাননীয় আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে হয় যে, জরুরি পরিস্থিতির কারণে মূল কাগজের পরিবর্তে ফটোকপি দাখিল করা হচ্ছে এবং পরবর্তীতে মূল কপি দাখিলের শর্তে এটি যেন গ্রহণ করা হয়। আদালত অনুমতি দিলে বেঞ্চ অফিসার দরখাস্তে স্বাক্ষর বা সিল দিয়ে দেন, যা ফাইলিং সেকশনে জমা দিতে হয়। May it please your Lordship(s), I beg permission for affidavit with photocopy of the annexe(s) যদি সিনিয়রের পক্ষে হয় তবে on behalf of বলে নিতে হবে।
৫। কোর্ট ক্রাফট ও শিষ্টাচার (Court Craft & Etiquette)
পোশাকের পরিচ্ছন্নতা: আইনজীবী হিসেবে আপনার প্রথম পরিচয় আপনার পোশাকে। হাইকোর্টের গাউন, ব্যান্ড এবং কলার যেন সবসময় পরিপাটি ও নিয়মমাফিক হয়।
কোর্টরুমে প্রবেশ ও প্রস্থান: কোনো এজলাসে প্রবেশের সময় এবং বের হওয়ার সময় মাননীয় বিচারপতির উদ্দেশ্যে হালকা মাথা নত (Bow) করে সম্মান প্রদর্শন করা যেতে পারে।
কথা বলার টোন: মাননীয় আদালতের সামনে সাবমিশন রাখার সময় গলার স্বর যেন অতিরিক্ত উচ্চ বা একদম নিচু না হয়। বিনীত কিন্তু আত্মবিশ্বাসে ভরপুর কণ্ঠে কথা বলুন। কোনো অবস্থাতেই প্রতিপক্ষের আইনজীবীর ওপর চড়াও হওয়া বা আদালতের সাথে তর্কে জড়ানো যাবে না। আর হাইকোর্ট বিভাগ একসাথে দুইজন ডায়াসে দাঁড়ানো যায় না এবং একজনের সাবমিশনের মধ্যে কথা বলা যায় না।
৬। ব্রিফ বা কেস স্টাডি প্রস্তুতি
ফ্যাক্টস (Facts) নখদর্পণে রাখা: মামলার মূল ঘটনা বা ফ্যাক্টস একদম পরিষ্কার থাকতে হবে। মাননীয় আদালত অনেক সময় দীর্ঘ আইনি ব্যাখ্যা না শুনে সরাসরি জানতে চান-“আপনার মামলার ফ্যাক্টসটা কী?”
আইনের ধারা ও নজির (Precedents): যে আইনের অধীনে মামলা করছেন, তার সুনির্দিষ্ট ধারা এবং আপনার পক্ষের সাপোর্টিং ডিএলআর (DLR), বিএলসি (BLC) বা এএলআর (ALR)-এর প্রাসঙ্গিক নজিরগুলো ফ্ল্যাগ (Flag) দিয়ে মার্ক করে রাখুন, যেন আদালত চাওয়া মাত্রই বের করে দেখানো যায়।
একটি ছোট্ট পরামর্শ: প্রথম কয়েক মাস নিজের মামলা না থাকলেও সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ এবং সিনিয়র আইনজীবীদের শুনানি (বিশেষ করে রিট বা গুরুত্বপূর্ণ আপিল শুনানি) কোর্টে বসে শুনুন। তারা কীভাবে যুক্তি উপস্থাপন করছেন, কীভাবে আদালতের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন এবং এই টার্মগুলো (Maiden appearance, Mention, Pass over) কীভাবে প্র্যাক্টিক্যালি ব্যবহার করছেন—সেটি লক্ষ্য করাই হবে আপনার জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আপনার ক্যারিয়ার গৌরবময় ও সফল হোক!
শেয়ার করে নতুন আইনজীবীদের সাহস জোগানোর অনুরোধ রইলো 🌹❤️