06/06/2026
মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর ভরণপোষণ: আইনি অধিকার ও প্রতিকার
দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর অন্যতম প্রধান এবং মৌলিক অধিকার হলো ভরণপোষণ বা ‘নাফকা’। বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম আইন এবং সংবিধিবদ্ধ আইন অনুযায়ী, বিয়ের পর স্ত্রীর অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ বহন করা স্বামীর আইনি ও ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। অনেক সময় দেখা যায়, সচেতনতার অভাব বা পারিবারিক বিরোধের কারণে স্ত্রীরা এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।
মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর ভরণপোষণের অধিকার এবং তা আদায়ের আইনি প্রতিকারগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ভরণপোষণ বলতে আইন কী বোঝায়?
ভরণপোষণ কেবল তিন বেলা খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামী শরিয়াহ এবং বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এর পরিধি ব্যাপক। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
* স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার।
* ঋতু ও আবহাওয়া উপযোগী পোশাক।
* একটি নিরাপদ, সম্মানজনক এবং পৃথক বাসস্থান (যেখানে স্ত্রীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় থাকে)।
* অসুস্থতায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ।
গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম: স্বামী আর্থিক সংকটে থাকলেও স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। স্বামীর দরিদ্রতা তাকে এই আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেয় না।
২. কখন স্ত্রী ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী?
যৌথ জীবনে:
বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী একসাথে বসবাসকালীন সময়ে স্ত্রী সম্পূর্ণ ভরণপোষণ পাবেন।
যুক্তিসঙ্গত কারণে পৃথক থাকলে: স্বামী যদি ক্রূঢ়তা বা নিষ্ঠুর আচরণ করেন, দ্বিতীয় বিয়ে করেন (স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া বা যথাযথ নিয়ম না মেনে), অথবা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন—তবে স্ত্রী পৃথক থেকেও স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন।
ডিভোর্স বা তালাকের পর (ইদ্দতকালীন সময়): তালাক কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইদ্দত পালনকাল (সাধারণত তিন মাস বা গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত) পর্যন্ত স্ত্রী ভরণপোষণ পাবেন।
৩. ভরণপোষণ না পেলে আইনি প্রতিকার কী?
কোনো স্বামী যদি যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই স্ত্রীর ভরণপোষণ বন্ধ করে দেন, তবে ভুক্তভোগী স্ত্রী প্রধানত দুটি উপায়ে আইনি প্রতিকার পেতে পারেন:
ক) পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ (Family Courts Ordinance, 1985) অনুযায়ী মামলা:
এটি ভরণপোষণ আদায়ের সবচেয়ে কার্যকর এবং প্রচলিত মাধ্যম।
# # কোথায় মামলা করবেন: স্ত্রীর বর্তমান বা স্থায়ী ঠিকানার এখতিয়ারাধীন সিনিয়র সহকারী জজ আদালত (যা পারিবারিক আদালত হিসেবে গণ্য)—সেখানে ভরণপোষণের দাবি করে মামলা দায়ের করতে হবে।
# # বকেয়া ভরণপোষণ: স্ত্রী কেবল বর্তমান বা ভবিষ্যৎ ভরণপোষণই নয়, বিগত সর্বোচ্চ ৩ বছরের বকেয়া ভরণপোষণও (Past Maintenance) এই আদালতের মাধ্যমে দাবি করতে পারেন।
# # আদালতের ডিক্রি জারি: আদালত স্বামীর আয় ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে মাসিক একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নির্ধারণ করে দেন। স্বামী তা দিতে ব্যর্থ হলে আদালত তার সম্পত্তি ক্রোক করতে পারেন বা দেওয়ানি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারেন।
খ) মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (Section 9) অনুযায়ী সালিশি পরিষদ:
আদালতে না গিয়ে দ্রুত প্রতিকারের জন্য স্ত্রী স্থানীয় সরকারের শরণাপন্ন হতে পারেন।
** পদ্ধতি: স্ত্রী তার এলাকার চেয়ারম্যান/মেয়র বা ইউনিয়ন পরিষদের কাছে ভরণপোষণ চেয়ে আবেদন করতে পারেন।
** সালিশি পরিষদ গঠন: চেয়ারম্যান সাহেব উভয় পক্ষকে নোটিশ দিয়ে একটি 'সালিশি পরিষদ' গঠন করবেন এবং স্বামীর দেওনিয়াত বা সামর্থ্য বিবেচনা করে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভরণপোষণের সার্টিফিকেট ইস্যু করবেন।
*** আপিল: সালিশি পরিষদের সিদ্ধান্তে কোনো পক্ষ সংক্ষুব্ধ হলে জেলা প্রশাসকের (DC) কাছে রিভিশন আবেদন করতে পারেন।
৪. কখন স্ত্রী ভরণপোষণ পাবেন না?
আইন অনুযায়ী কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে স্ত্রী ভরণপোষণের অধিকার হারাতে পারেন:
** কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই যদি স্ত্রী স্বামীর সাথে বসবাস করতে অস্বীকার করেন বা স্বামীর অবাধ্য (Nushuz) হন।
** স্ত্রী যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হন।
** নাবালিকা হওয়ার কারণে যদি বিবাহ বন্ধনটি কার্যকর (Consummated) না হয়।
** তালাকের ইদ্দতকাল পার হয়ে যাওয়ার পর (যদি না তিনি গর্ভবতী থাকেন)।
# #শেষ কথা
বাংলাদেশের আইন স্ত্রীকে ভরণপোষণের ব্যাপারে শক্তিশালী সুরক্ষা দিয়েছে। অনেক সময় ভুল ধারণার কারণে মনে করা হয়, ডিভোর্স না হলে ভরণপোষণের মামলা করা যায় না—যা সম্পূর্ণ ভুল। দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় থাকা অবস্থাতেও স্বামী যদি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন, তবে স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে তার এই ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারেন। আইন জানা এবং সঠিক সময়ে সঠিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়াই পারে একজন নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে।