27/08/2026
👉কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধান বা তদন্ত চলছে, অথবা তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়েছে—এই কারণে কি কর্তৃপক্ষ ইচ্ছামতো তাকে দেশের বাইরে যেতে বাধা দিতে পারে কিংবা তার পাসপোর্ট আটকে রাখতে পারে?
এর উত্তর সরাসরি “হ্যাঁ” নয়।
📍সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৬ প্রত্যেক নাগরিককে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া এবং বাংলাদেশে ফিরে আসার অধিকার দিয়েছে। এই অধিকার অবশ্য নিরঙ্কুশ নয়। জনস্বার্থে আইন দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ থাকতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিধিনিষেধটি অবশ্যই আইনের ভিত্তিতে হতে হবে। কোনো নির্বাহী কর্তৃপক্ষের নিজস্ব নির্দেশ, চিঠি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, যদি তার পেছনে নির্দিষ্ট আইনগত ক্ষমতা না থাকে, তাহলে একজন নাগরিকের বিদেশযাত্রার মৌলিক অধিকার সীমিত করা যায় না।
অর্থাৎ, “তদন্ত চলছে” বা “দুর্নীতির অভিযোগ আছে”—এই কথাগুলো নিজেরাই বিদেশযাত্রা বন্ধ করার আইনগত ক্ষমতা সৃষ্টি করে না। কর্তৃপক্ষকে দেখাতে হবে—কোন আইনের অধীনে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সেই আইন এমন নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতা দিয়েছে কি না এবং আরোপিত নিষেধাজ্ঞাটি জনস্বার্থে যুক্তিসঙ্গত কি না।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মৌলিক অধিকার সীমিত করার ক্ষেত্রে শুধু কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ভালো হলেই যথেষ্ট নয়; পদ্ধতিটিও আইনসম্মত হতে হবে। দুর্নীতি তদন্ত করা অবশ্যই রাষ্ট্রের বৈধ দায়িত্ব। কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি যেন দেশ ছেড়ে গিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া এড়িয়ে যেতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যেও প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ থাকতে পারে। কিন্তু সেই বিধিনিষেধের জন্য আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে এবং বিধিনিষেধটি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বা স্বেচ্ছাচারী হওয়া যাবে না।
আরও সহজভাবে বললে, রাষ্ট্রের স্বার্থ এবং ব্যক্তির স্বাধীনতা—দুটোর মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা তদন্ত থাকলেই তার সব মৌলিক অধিকার শেষ হয়ে যায় না। আদালতকে দেখতে হবে, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে যে উদ্দেশ্য অর্জন করতে চাওয়া হচ্ছে, তার মধ্যে বাস্তব ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে কি না এবং সেই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যতটুকু বিধিনিষেধ প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে কি না।
এই জায়গায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—“reasonable restriction” মানে শুধু কর্তৃপক্ষের কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হওয়া নয়। বিধিনিষেধের যুক্তিসঙ্গততা আদালত পর্যালোচনা করতে পারে। আইনসভা কোনো বিধিনিষেধকে প্রয়োজনীয় মনে করলেও সেটিই শেষ কথা নয়। আদালত পরীক্ষা করতে পারে—বিধিনিষেধটি স্বেচ্ছাচারী কি না, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কি না এবং যে উদ্দেশ্যে আইন করা হয়েছে তার সঙ্গে বিধিনিষেধের সরাসরি বা নিকটবর্তী সম্পর্ক আছে কি না।
তাই কোনো ব্যক্তির পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে অথবা বিমানবন্দরে তাকে বিদেশ যেতে দেওয়া হয়নি—এমন পরিস্থিতিতে শুধু “আমার বিরুদ্ধে মামলা আছে” বা “দুর্নীতি কমিশন আমাকে আটকে দিয়েছে”—এখানেই বিষয়টি শেষ নয়। দেখতে হবে কোন আদেশের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সেই আদেশের আইনগত ভিত্তি কী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সেই ক্ষমতা আছে কি না এবং বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না।
এই রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—শুধু কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি মামলায় জড়িত আছেন বলেই তিনি তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে যান না। আদালত স্পষ্ট করেছে যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে criminal proceeding থাকা তার মৌলিক অধিকারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত করে না। অবশ্য, যদি তার বিদেশে চলে যাওয়ার বাস্তব আশঙ্কা থাকে এবং আইন সেই পরিস্থিতিতে travel restriction-এর অনুমতি দেয়, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এখানে সাধারণ মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব শিক্ষা আছে। পাসপোর্ট আটকে রাখা, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, ইমিগ্রেশনে বাধা—এসবকে শুধু প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এগুলো সরাসরি একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে এমন কোনো পরিস্থিতিতে আদেশটির আইনগত উৎস, ক্ষমতার সীমা এবং অনুসৃত প্রক্রিয়া পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রায়ে আরও বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তিকে জরুরি পরিস্থিতিতে কোনো কারণ না দেখিয়ে বিদেশযাত্রা থেকে বিরত রাখা হয় এবং পাসপোর্ট জব্দ করা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উপযুক্ত বিশেষ আদালতের কাছে post-approval নেওয়ার জন্য আবেদন করতে হবে; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শুনানির সুযোগ দিতে হবে এবং আদালতকে বিষয়টি নির্ধারণ করতে হবে।
অর্থাৎ, রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা থাকলেও সেই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। ক্ষমতা প্রয়োগের সঙ্গে আইন, প্রক্রিয়া, যুক্তিসঙ্গততা এবং বিচারিক তদারকি—সবকিছুর সম্পর্ক রয়েছে।
এই নীতির আলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো—“মামলা আছে, তাই বিদেশ যেতে পারবেন না”—এটি কোনো স্বয়ংক্রিয় আইন নয়। বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিতে হলে আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে এবং সেই নিষেধাজ্ঞা যুক্তিসঙ্গত, প্রয়োজনীয় ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট হতে হবে। আইন ছাড়া কেবল নির্বাহী নির্দেশের মাধ্যমে মৌলিক অধিকার সংকুচিত করা যায় না।
📍এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলো বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের Durnity Daman Commission Vs. G.B. Hossain and Others, Civil Petition for Leave to Appeal Nos. 1340 of 2021, 1184, 1009, 605 of 2020 and 1523 of 2021, decided on 27 September 2021, মামলায় একত্রে বিবেচনা করা হয়েছে।
📍রায়ের সারকথা: বিদেশে যাওয়ার অধিকার মৌলিক অধিকার; এটি নিরঙ্কুশ নয়, কিন্তু সীমিত করতে হলে অবশ্যই আইন থাকতে হবে। নির্বাহী আদেশের নিজস্ব ক্ষমতায়, আইনগত ভিত্তি ছাড়া, একজন নাগরিকের বিদেশযাত্রা বন্ধ করা সাংবিধানিকভাবে টেকসই নয়। আর কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি মামলায় জড়িত থাকলেও তিনি তার মৌলিক অধিকার থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বঞ্চিত হন না।