08/06/2026
বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা। আপনি দেশ ছাড়তে পারবেন না! অথচ আপনার নামে কোনো মামলা নেই, কোনো ওয়ারেন্টও নেই। স্রেফ একটা চিঠির জোরে কি আপনাকে এভাবে আটকে দেওয়া সম্ভব? তাফসির মোহাম্মদ আউয়াল বনাম বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী সরকার এবং অন্যান্য মামলার রায় আজ আলোচনা করবো। আইনের শিক্ষার্থী, গবেষণা, আইনজীবী ও সাধারণ নাগরিকদের জানার সুবিধার্থে আলোচনা করবো।
♈রায়ের তারিখ: ২৪/০২/২০২২
♈মাননীয় বিচারপতি মোঃ নজরুল ইসলাম তালুকদার এবং মাননীয় বিচারপতি মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান।
মামলার প্রেক্ষাপট (Fact of the Case):
Writ petitioner তাফসির মোহাম্মদ আউয়াল বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন দ্বৈত নাগরিক (Dual Citizen) এবং দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ 'মাল্টিমোড গ্রুপ'-এর অন্যতম পরিচালক।
✅তিনি নিয়মিত ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিদেশে যাতায়াত করেন। ২৪ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে তিনি তাঁর যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মেয়ের জন্মদিনে যোগদানের উদ্দেশ্যে লন্ডন যাওয়ার জন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান।
✅বিমানের চেকিং সম্পন্ন করে বোর্ডিং পাস (Boarding Pass) নেওয়ার পর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁকে প্রায় ২ ঘণ্টা বসিয়ে রাখে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মৌখিক নির্দেশনার অজুহাত দেখিয়ে তাঁকে অফলোড (Off-loaded) করে অর্থাৎ দেশ ত্যাগে বাধা দেয়। পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC) কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা বা ওয়ারেন্ট ছাড়াই স্রেফ একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকের (Memo) মাধ্যমে তাঁর ওপর এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা (Travel Ban) জারি করেছে।
✅যদিও আবেদনকারী ইতিপূর্বেই দুদকের তলব অনুযায়ী হাজির হয়ে সব ধরনের তথ্য সরবরাহ করেছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পেন্ডিং ছিল না।
✅মামলার কারণ (Cause of Action)
কোনো সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলা (Specific Criminal Case) কিংবা আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (Warrant of Arrest) ছাড়াই, স্রেফ প্রশাসনিক চিঠির বা স্মারকের ওপর ভিত্তি করে একজন নাগরিকের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা এবং বিমানবন্দরে তাঁকে হয়রানি করার মাধ্যমেই এই মামলার ‘Cause of Action’ বা মামলার কারণ উদ্ভূত হয়েছে। এটি সরাসরি নাগরিকের মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ।
✅রিট পিটিশন দায়ের (Filing of Writ Petition)
দুদকের এই স্বেচ্ছাচারী ও বেআইনি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে writ petitioner has challenged under Article 102 of Constitution and challenged the travel ban memo issued by the ACC.
✅রুল ইস্যু (Rule Nisi)
আবেদনটি প্রাথমিক শুনানির পর মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ প্রতিপক্ষ তথা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর একটি 'Rule Nisi' (রুল নিশি) জারি করেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়— কেন আবেদনকারীকে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়ার এই পদক্ষেপ এবং দুদকের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার স্মারকটিকে বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না।
✅Issuance of Interim Order:
রুল জারির পাশাপাশি আদালত একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা প্রাথমিক আদেশ (Interim Order) প্রদান করেন। এই আদেশে বলা হয়, যদি আবেদনকারীর বিরুদ্ধে আদালতে কোনো সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পেন্ডিং না থাকে, তবে তাঁকে আগামী ৩ (তিন) মাসের জন্য বিদেশে যাওয়ার এবং পুনরায় দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
✅আবেদনকারীর আইনজীবীর বক্তব্য (Submissions of the Petitioner’s Advocate): আবেদনকারীর পক্ষে বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবী অত্যন্ত জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন:
🔴তিনি সাবমিট করেন যে, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলা নেই, কোনো এফআইআর (FIR) নেই এবং আদালত থেকেও কোনো ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়নি।
🔴সংবিধানের Article 36 অনুযায়ী, একজন নাগরিকের চলাচলের স্বাধীনতা (Freedom of Movement) এবং দেশ ত্যাগ ও প্রত্যাবর্তনের অধিকার একটি ইনালিয়েনেবল (Inalienable) বা অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার।
🔴দুদক আইন, ২০০৪ বা দুদক বিধিমালা, ২০০৭-এর কোথাও কমিশনকে স্রেফ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কোনো ব্যক্তির বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট বা পরোক্ষ ক্ষমতা (Express or Implied Power) দেওয়া হয়নি।
🔴UDHRএর ১৩ অনুচ্ছেদ এবং আপিল বিভাগের পূর্ববর্তী নজিরসমূহ (Precedents) উল্লেখ করে বলেন, কোনো নাগরিককে আটকাতে হলে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট মামলা করে আদালতের ‘Custodial Order’ বা হেফাজতের আদেশ নিতে হবে।
🔴 the learned Advocate has has referred to legal decisions taken in the cases of H.M. Ershad vs. Bangladesh reported in 7 BLC(AD)67, Bangladesh vs. Allama Delwar Hossain Sayeedi reported in 16 BLC(AD)51, Mohammad Tajul Islam vs. Bangladesh and others reported in 25 BLT(HC)195 and Arif Hossen vs. Bangladesh reported in 25 BLC(HC)337.
✅দুর্নীতি দমন কমিশন ও সরকারের বক্তব্য (Submissions on behalf of the ACC & Government): দুদকের পক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবী এই রিটের বিরোধিতা করে যুক্তি দেখান:
🔴Writ petitioner একজন দ্বৈত নাগরিক এবং আদালতের প্রাথমিক আদেশের সুযোগ নিয়ে তিনি বিদেশে চলে গেছেন এবং বর্তমানে তাঁর 'Whereabouts' বা অবস্থান আদালত বা দুদকের কাছে অজ্ঞাত।
🔴তিনি আপিল বিভাগের একটি সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত Durnity Daman Commission vs. GB Hossain and others reported in 74 DLR (AD) (2022),1 উল্লেখ করে বলেন, সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত চলাচলের অধিকারটি কোনো পরম বা অসীম অধিকার (Non-absolute Right) নয়।
🔴আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধের তদন্তের স্বার্থে কোনো ব্যক্তি যেন আইনগত প্রক্রিয়া এড়াতে দ্রুত দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারেন, সেজন্য ভ্রমণের ওপর যৌক্তিক বিধিনিষেধ আরোপ করার এখতিয়ার রাষ্ট্রের রয়েছে। তাই রুলটি খারিজ (Discharge) করার আবেদন জানান।
✅আদালতের পর্যবেক্ষণ (Observations of the Court)
উভয় পক্ষের বক্তব্য ও আইন পর্যালোচনার পর মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ (Observations) প্রদান করেন:
🔴আদালত স্পষ্ট করে বলেন, দুদক আইন বা বিধিমালার কোথাও দুদককে নিজে থেকে কোনো নাগরিকের দেশ ত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা (Embargo) দেওয়ার একক বা চূড়ান্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
🔴চলাচলের স্বাধীনতা একটি সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। আইন প্রণয়ন ছাড়া স্রেফ প্রশাসনিক বা নির্বাহী আদেশের (Executive Order) মাধ্যমে এই অধিকার খর্ব করা যায় না। বিধিনিষেধের যৌক্তিকতা বিচারের চূড়ান্ত এখতিয়ার বিচার বিভাগের।
🔴আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তদন্তের স্বার্থে যদি জরুরি ভিত্তিতে কারও বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দিতেও হয়, তবে তা জারির ৩ কার্যদিবসের (3 Working Days) মধ্যে সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতের (Court of Jurisdiction) মাধ্যমে অনুমোদন বা নিশ্চিত করিয়ে নিতে হবে। আদালতের সিল বা অনুমোদন ছাড়া দুদকের এমন স্মারকের কোনো আইনি কার্যকারিতা (Legal Efficacy) নেই।
🔴আদালত আবেদনকারীর আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আদালতকে না জানিয়ে বিদেশে অবস্থান করা অনুচিত। নাগরিক হিসেবে আদালতের প্রতি আরও যত্নশীল ও শ্রদ্ধাশীল (Respectful to the Law) হওয়া আবশ্যক।
✅রায় (Final Judgement):
মাননীয় আদালত সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে রিট পিটিশনটি (Rule Nisi) আপিল বিভাগের ‘Durnity Daman Commission vs. GB Hossain and others reported in 74 DLR (AD) (2022),1’ মামলার সিদ্ধান্তের আলোকে নিষ্পত্তি (Disposed of) ঘোষণা করেন।
🔴আদালতের অনুমোদন ব্যতীত আবেদনকারীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দুদকের বিতর্কিত স্মারকটির
declared illegal and without lawful authority :
🔴তবে, দুদকের যদি পর্যাপ্ত ও সুনির্দিষ্ট কারণ থাকে, তবে তারা আবেদনকারীর বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতের কাছে আবেদন করার স্বাধীনতা (Liberty) পাবে।
🔴আবেদনকারীকে আদালতের আদেশের প্রতি ভবিষ্যতে আরও সতর্ক এবং শ্রদ্ধাশীল থাকার নির্দেশ দেওয়া হলো।
যেকোনো মতামত, সংশোধনী, পরামর্শ প্রদান করতে পারেন। যাচাই-বাছাই পূর্বক সংশোধন করা হবে।
কালেক্টেড
অ্যাডভোকেট নুর কুতুবুল আলম পাটোয়ারী মিরন
কুতুব জুরিস্ট চেম্বার
(অ্যাডভোকেট, ব্যারিস্টার ও লিগ্যাল কনসালটেন্টস)
ঠিকানা: রুম নং সি ২৬ এ, ৪র্থ তলা
নাহার কমপ্লেক্স , ঢাকা জজ কোর্ট
মোবাইল: 01718-775097
#আইনি_পরামর্শ
#আইনি_পরামর্শ,
ালত, ,