10/03/2025
ফেসবুকে তিনটি ধর্ষণ মামলার উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ শেয়ার করে একটি পোস্ট করা হয়েছিল। পোস্টদাতা মামলাগুলোর প্রকৃত ঘটনা ও প্রেক্ষাপট না বুঝে আদালতের পর্যবেক্ষণকে ভুলভাবে উদ্ধৃত (misquote) করেছেন, যা উচ্চ আদালতের ন্যায্য সিদ্ধান্তকে জনসাধারণের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই এর যথাযথ জবাব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছি।
উক্ত মামলাগুলো হলো—
1. Shahjahan Vs State, Criminal Appeal 1323 of 1998
2. Md. Shafi Khan Vs State, 2012, 64 DLR 418
3. Ayub Ali Sheikh Vs State, 2011, 63 DLR 55
১।
পোস্টদাতার ভাষ্যঃ “Shahjahan Vs State, Criminal Appeal 1323 of 1998: কোর্ট বলছে ফোর্সেবল ইন্টারকোর্সের জন্য প্রাইভেট পার্টস এ ক্ষত থাকতে হবে। যেহেতু নাই, তাই রে*প হয় নাই। আরও বলা হইছে যে ২০ বছরের ভিক্টিমের কনসেন্ট ছাড়া ইন্টারকোর্স হইছে সেটা বিলিভেবল না। “
ঘটনা পরিক্রমাঃ ১৯৯৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মামলার ঘটনাস্থল ছিল চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা। ভুক্তভোগী নারী মুন্না এবং অভিযুক্ত শাহজাহান চিওড়া কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। মুন্নার বাবা ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন এবং ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫ অপহরণ ও ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন। তাদের মধ্যকার প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং সে বিষয়ে কলেজের শিক্ষক আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ১৯৯৫ সালের ২৮ আগস্ট তারা বিয়ে করেন এবং বিভিন্ন স্থানে কিছুদিন একসঙ্গে বসবাস করেন। বিয়ের পক্ষে তারা ৩০ আগস্ট ১৯৯৫ ও ৪ অক্টোবর ১৯৯৫ তারিখে এফিডেভিট প্রদান করেন। মুন্না তার বাবা, মা ও ভাইকে চিঠির মাধ্যমে জানান যে তিনি স্বেচ্ছায় শাহজাহানকে বিয়ে করেছেন, পাশাপাশি দুজনের যৌথ ফটোগ্রাফ পাঠান । তবে পরবর্তীতে তিনি দাবি করেন যে কাবিননামা, চিঠি ও এফিডেভিটে তার স্বাক্ষর জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত, ৩১ অক্টোবর ১৯৯৫, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফরের মধ্যস্থতায় মুন্নাকে তার বাবার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং ১ নভেম্বর ১৯৯৫ তিনি পিতার কাছে ফিরে যান। স্থানীয় সালিসে মুন্না জানান যে তিনি শাহজাহানের সঙ্গে আর থাকতে চান না, তবে সেখানে অপহরণ বা ধর্ষণের কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি।
কলেজের শিক্ষক আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে মুন্না কাজী জাফরের সামনে শাহজাহানের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ও বিয়ের কথা স্বীকার করেছিলেন।
***মুন্নার পুরো দাবির পক্ষে একমাত্র স্বাক্ষী তিনি নিজেই। পাশাপাশি, তার দাবির মধ্যেই উপরোক্ত বেশ কয়েকটি অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা যায়।
উপরোক্ত তথ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে আপনাদের কী মনে হয়— মুন্না ও শাহজাহান স্বেচ্ছায় পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছেন, নাকি শাহজাহান ও তার সহযোগীরা তাকে অপহরণ করেছে? আশ্চর্যের বিষয় হলো, সবাই যদি মুন্নাকে অপহরণ করে থাকে, তবে ধর্ষণের অভিযোগ শুধুমাত্র শাহজাহানের বিরুদ্ধে কেন?
যাহোক এ রায়ের ৫২ নাম্বার প্যারার বলা হয়েছে “Munna was examined by the Civil Sergeon, Cumilla on 15-11-1995. Civil Sergeon did not find any sign of r**e and also, did not find any injury. In the event of any forcible in*******se , there would have been marks of violence on the secreat organ of Munna. Even if there would have been any sexual in*******se that was definitely with the consent of Munna.” এখানে আদালত বলতে চাইলেন কী আর ওইটার তর্জমা করা হলো কী! উপরের শব্দগুলো দ্বারা কোথাও কী বলা হয়েছে যে, প্রাইভেট পার্টস এ ক্ষত থাকা ছাড়া ফোর্সেবল ইন্টারকোর্স বা রেপ হবে না? আর ২০ বছরের বিষয়টা পোস্টদাতা যেভাবে উল্লেখ করেছেন তেমন না। আদালত বলেছেন নোটারি, এফিডেভিট ও পি ডব্লিউ ২ এ জবানবন্দী দেয়ার সময় মুন্না নিজে স্বীকার করেছেন যে তার বয়স ২০ বছর। বয়স কেন ধর্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়, তা বুঝতে হলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ধারা ২(ট) অনুযায়ী শিশুর সংজ্ঞা দেখতে হবে। আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, "শিশু" অর্থ অনধিক ১৬ বছর বয়সী কোনো ব্যক্তি। আদালত মূলত যাচাই করেছেন যে মুন্না শিশু ছিলেন কি না। যদি তিনি শিশু হতেন, তাহলে তার সম্মতি (consent) থাকলেও সেটি আইনি বৈধতা পেত না এবং সেটি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হতো।
আদালত প্রথমে নারী হিসেবে মুন্না ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কিনা, তা বিবেচনা করেছেন। এরপর শিশু হিসেবে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কিনা, সেটিও পর্যবেক্ষণ করেছেন। এ কারণেই ২০ বছর বয়সের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
কারণ ৯ (১) ধারা অনুসারে “যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।
ব্যাখ্যা৷- যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।…”
২।
পোস্টদাতার ভাষ্যঃ “( Md Shafi Khan Vs State, 2012, 64 DLR 418): ভিক্টিমের বয়স নয় বছর। মেডিকেল এক্সামিনেশনে রে*পের চিহ্ন, ভ্যাজাইনাল টিয়ার, ইনজুরি পাওয়া গেছে।
রায় আসলো এগুলা এনাফ এভিডেন্স না, যেহেতু কোনো এক্সটার্নাল ইনজুরি নাই।
মজার বিষয় কি জানেন? মাইনরের কন্সেন্ট নিয়েও ইন্টারকোর্স ইটসেল্ফ আইন অনুযায়ী রে*প, সেখানে এই রায় আসলো। “
ঘটনা পরিক্রমাঃ
২।
পোস্টদাতার ভাষ্যঃ “( Md Shafi Khan Vs State, 2012, 64 DLR 418): ভিক্টিমের বয়স নয় বছর। মেডিকেল এক্সামিনেশনে রে*পের চিহ্ন, ভ্যাজাইনাল টিয়ার, ইনজুরি পাওয়া গেছে।
রায় আসলো এগুলা এনাফ এভিডেন্স না, যেহেতু কোনো এক্সটার্নাল ইনজুরি নাই।
মজার বিষয় কি জানেন? মাইনরের কন্সেন্ট নিয়েও ইন্টারকোর্স ইটসেল্ফ আইন অনুযায়ী রে*প, সেখানে এই রায় আসলো। “
ঘটনা পরিক্রমাঃ ২৭ ডিসেম্বর ২০০৪ সালে ৯ বছর বয়সী কন্যা তসলিমাকে ধর্ষণের অভিযোগে মো শফীকে অভিযুক্ত করে ঘটনার পরেরদিন ২৮ ডিসেম্বর ২০০৪ ভিক্টিমের বাবা আ হামিদ খান এফ আই আর দায়ের করেন। সেদিন ভিক্টিমকে ডাক্তারি পরীক্ষা করা হয়, যাতে she found sign of r**e on her. এ রায়ের ১৫ প্যারায় সে সম্পর্কিত বর্ণনায় আছে "Examination was done by doctor Kharduness with the help of the S.N. Shema Khatun ( not by the doctor, who deposed in court as P.W. 5), no external sign of injury is found over the body.
Va**na - No abnormality detected,
menstruation- not yet started
va**na swab was taken for spermatozoa,
report show- no spermatozoa."
"....Considering all these observation although it is apparently found that there is no
sexual assault on the victim, even though the doctor gave report and make a comment
that "Nature of injury indicate perineal tear due to sexual assault which was absolutely
inconsistent on examination of the victim," The medical report thus did not support the
prosecution story."
পোস্টদাতার ভাষ্য অনুসারে ম্যাডিকেল এক্সামিনেশনে রে*পের চিহ্ন, ভ্যাজাইনাল টিয়ার, ইনজুরি পাওয়া গেছে বলা হয়েছে, কিন্তু ম্যাডিকেল এক্সামিনেশনে ভ্যাজাইনাতে কোনো অস্বাভাবিকতা বা স্পার্ম পাওয়া যায়নি, তা স্বত্তেও ডাক্তার মন্তব্য করে রিপোর্ট দিয়েছেন " Nature of injury indicate perineal tear due to sexual assault" যা অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রসিকিউশন স্টোরি অনুসারে ভিক্টিমকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়, এতে সে রক্তাক্ত হয়। কিন্তু জোরজবরদস্তির কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি। রক্তাক্ত হয়েছে কিন্তু কোনো ইনজুরি মার্ক নেই। পোস্টদাতা ভালোভাবে পয়েন্ট আউট করেছেন যেহেতু ভিক্টিম শিশু ইনজুরি লাগবেনা, শুধু ইন্টারকোর্স ই রেপের সমতুল্য। হোক সেটা মাইনরের সম্মতিতে বা সম্মতি ছাড়া।
এখন আমার প্রশ্ন, ইন্টারকোর্স যে হয়েছে তার প্রমাণ কী? ম্যাডিকেল এক্সামিনেশনে এমন কোনো তথ্য নেই। রিপোর্টে আছে "va**na swab was taken for spermatozoa,
report show- no spermatozoa.
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নেই যা স্বাভাবিক। ভিক্টিমের একক জবানবন্দিও অনেক সময় সাজার ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে ঘটনার সাথে অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণ করোবোরেট করতে হয়। ভিক্টিমের সাক্ষ্যগ্রহণের সময় দেখা যায় ঘটনার পূর্বে অভিযুক্ত শফিকে দেখে ভিক্টিমের পাশে থাকা ২ জন পালিয়ে যায়, যারা এ মামলায় সাক্ষী দেয়নি।
এটা এমন একটা ঘটনা,
১. যেখানে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নেই,
২. ভিক্টিমকে শেষবার অভিযুক্তের সাথে দেখেছেন এমন ২ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য নেই,
৩. ম্যাডিকেল এক্সামিনশনে প্রাইভেট পার্টে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।
৪. ভিক্টিমকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়েছে দাবি করা হয় কিন্তু তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো ইনজুরি মার্ক শরীরে নেই;
৫. ইন্টারকোর্স হয়েছে তারও প্রমাণ নেই
শুধু একটা মন্তব্য আছে " Nature of injury indicate perineal tear due to sexual assault", এর উপর ভিত্তি করে কাউকে ধর্ষণের সাজা দেয়া যায়? এই আঘাত অন্য কোনোভাবে প্রাপ্ত হলে। এটা শুধু একটা মন্তব্য, কোনো সাক্ষ্য না যার উপর ভিত্তি করে এককভাবে সাজা দেয়া যায় না।
৩।
পোস্টদাতার ভাষ্যঃ ( Ayub Ali Sheikh Vs State, 2011, 63 DLR 55) : ভিক্টিম ৬ বছরের। রে*পের পর ইনফেকশন হয়ে যায় তার প্রাইভেট অর্গানে। ১০ দিন লাগছিলো মেডিক্যাল এক্সামিনেশনে। কোর্ট বললো ট্রিটমেন্ট টা ছিলো ইনফেকশনের, আর যেহেতু স্পার্ম পাওয়া যায় নাই, তাই এখানেও রে*প কমিটেড হয় নাই।
ঘটনা পরিক্রমাঃ ১৪ আগস্ট ২০০৮ সালে ৬ বছর বয়সী কন্যা মোসা লিপিকে ধর্ষণের অভিযোগে আইয়ুব আলী শেখকে অভিযুক্ত করে ঘটনার ১২ দিন পর ২৯ আগস্ট ভিক্টিমের মা মোসা ফরিদা খাতুন এফ আই আর দায়ের করেন। এফ আই আর দায়েরের পূর্বে ২৬ আগস্ট ২০০৮ ডাক্তারি পরীক্ষায় ভিক্টিমের ফিমেল পার্টে পুজভর্তি ইনফেকশন পাওয়া যায়; যা সেক্সুয়াল এসল্ট এর কারণে হতে পারে আবার চুলকানির (etching) কারণেও হতে পারে । তবে ডাক্তার ভিক্টিমের ফিমেল পার্টে কোন ইনজুরি মার্ক বা স্পার্ম পাননি। ডিফেন্স কেস ছিল পূর্বে এক সালিসে বাদীর পরিবারকে ৫০০ টাকা জরিমানা করায় শত্রুতাবশত বাদী এ মামলা করেছেন। ভিক্টিম মাইনর হওয়ার it is inherently improbable to commit r**e on her. অভিযুক্তের আইনজীবী দাবি করেন এ মামলায় প্রদত্ত ম্যাডিকেল সার্টিফিকেট প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর জবাবে আদালত উলটো এটা বলেন যে, ধর্ষণের মামলায় ম্যাডিকেল সার্টিফিকেটের অনুপস্থিতি need not necessarily result in failure of the case।
এ মামলার রায়ের ১৮ নং প্যারায় উল্লেখ করা হয়েছে , “ … That the victim was taken to the doctor with an allegation of infection on her ge***al organ…such infection might be caused by itching as well. Besides, the victim was not taken to the doctor for treatment of any injury on her female part following the alleged incident of r**e. Admittedly, she was taken to the doctor for treatment of infection on her female part.” এখানে কোথাও বলা হয়নি যে রেপের পর প্রাইভেট অর্গানে ইনফেকশন হয়। ইনফেকশন হওয়ায় ডাক্তারের কাছে নেয়া হয়েছে কিন্তু মধ্যবর্তী ১০ দিনে ফিমেল পার্টের ইনজুরির চিকিতসার জন্য ডাক্তারের কাছে নেয়া হয়নি।
মূলত সাক্ষীদের সাক্ষ্যেও গড়মিল, ভিক্টিমের জবানবন্দি বিশ্বাসযোগ্য না হওয়া এবং অভিযুক্ত অপরাধ করেছে ও করেনি দুটো views are equally reasonable হওয়ার এ মামলায় অভিযুক্তকে খালাস দেয়া হয়। স্পার্ম পাওয়া যায়নি তাই রেপ সংগঠিত হয়নি এমন অবজারভেশন আদালত দেননি। স্পার্ম পাওয়া যায়নি এটা উল্লেখ আছে ডাক্তারের জবানবন্দীতে , যা আদালত সেভাবে কনসিডারেশনে আনেননি। উলটো আদালত এটা বললেন ম্যাডিকেল সার্টিফিকেট নাই মানে রেপের মামলা ব্যর্থ হবে, এমন না।
প্রায় প্রত্যেকটা বক্তব্য মিসলিডিং। যাইহোক, অনেক কথার মাঝে পোস্টদাতা রিফর্ম চেয়েছেন, তা সমর্থন করলাম।