03/02/2026
চীনকে পছন্দ বা অপছন্দ করা আলাদা বিষয়; কিন্তু বৈশ্বিক শক্তির মানচিত্র বদলালে সেখান থেকে নিজেদের জন্য তুলনামূলক ভালোটাকে না দেখার ভান করা আত্মঘাতী
গত ৩০–৪০ বছরে পৃথিবীতে যে পরিবর্তনটা হয়েছে, সেটা যদি একটু খেয়াল করেন, তাইলে বুঝবেন চায়না এমন কিছু করছে যা অন্য কোনো দেশ কল্পনাও করতে পারে নাই।
একটা দেশ যাকে একসময় “চিপ লেবার” বলা হইতো, “লো কোয়ালিটি প্রোডাক্ট”-এর দেশ বলা হইতো, সেই দেশ আজ পৃথিবীর ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাকবোন।
আজ পৃথিবীতে যত জাহাজ বানানো হয়, তার প্রায় অর্ধেক চায়নায় তৈরি। রিসার্চ ফান্ডিংয়ে তারা যেভাবে টাকা ঢালতেছে, তাতে আগামী দশকগুলোতে কে ইনোভেশন কন্ট্রোল করবে, সেটা বোঝার জন্য আলাদা করে ভবিষ্যৎ দেখতে হয় না।
চায়নার সবচেয়ে বড় শক্তি হইলো তারা চুপচাপ কাজ করে, Huawei র কথাই ধরেন
এনভিডিয়া নিয়ে যত কথা হয়,তারা যেই পরিমাণে লাফালাফি করেন, আপনি Huawei কে দেখন তারা কিন্তু আজাইরা এতো লাফালাফি করে না, তারা স্ট্রাটেজিক কাজ করে।
একইভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অ্যাপগুলোর বড় একটা অংশ চাইনিজ, কিন্তু তারা কালচারাল দখলদারির চেষ্টা করে না।
ইভি মার্কেটে দেখেন, টেসলার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসছে চায়না থেকে, বিশেষ করে বিওয়াইডির মতো কোম্পানি দিয়ে। কিন্তু তারা হৈচৈ করে না, শুধু প্রোডাক্ট দিয়ে কথা বলে।
মুসলমানদের জন্য এখানে শেখার জায়গাটা অনেক। ইতিহাসে মুসলমানরা একসময় জ্ঞান, শহর, বাণিজ্য আর ইনোভেশনে নেতৃত্ব দিয়েছে। কুফা একসময় প্যারিস বা লন্ডনের থেকেও বড় ও গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল।
পারস্য ছিল হাজার বছরের সুপারপাওয়ার, আর সেই পারস্যকে মুসলমানরা কনকর করেছে এমন এক সময়ে, যখন তারা নিজেরাই কোনো সুপারপাওয়ার ছিল না। এইটা গল্প না, এইটা ইতিহাস। আজ সেই সাহস, সেই দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা মুসলিম উম্মাহ হারিয়ে ফেলছে।
চায়নার উত্থান আমাদের সামনে একটা জীবন্ত উদাহরণ কীভাবে দারিদ্র্য, অপমান আর অবহেলা থেকে উঠে এসে একটা দেশ নিজেকে গ্লোবাল সেন্টারে নিয়ে যায়।
অনেকে বলে, চায়না মুসলমানদের জন্য ভালো না। কিন্তু হুই মুসলিমদের ইতিহাস দেখেন। ট্যাং ডাইনেস্টির সময় থেকে ইসলাম চায়নায় এসেছে, মসজিদ তৈরি হয়েছে, আর আজও সেগুলো রেসপেক্টের সাথে টিকে আছে।
গুয়াংঝুর সেই পুরোনো মসজিদ শুধু ধর্মীয় জায়গা না, এটা প্রমাণ করে চায়না কখনোই মুসলমানদের সংস্কৃতি মুছে ফেলতে চায় নাই। মূলত চায়নার আগ্রহ কালচারে না, তাদের আগ্রহ ইকোনমিক পার্টনারশিপে।
আজকের চায়না ড্রোন ব্যবহার করে পরিবেশ পরিষ্কার রাখে, পাহাড়ের ভেতর থেকে ময়লা তুলে আনে, অটোমেশন দিয়ে মানুষের কষ্ট কমায়। একই প্রযুক্তি অন্য জায়গায় ব্যবহার হয় মানুষ মারার জন্য। এখানেই পার্থক্যটা বোঝা দরকার।
প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ না, ব্যবহারটাই আসল। চায়না প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে এফিশিয়েন্সি, উৎপাদন আর লাইফ কোয়ালিটি বাড়ানোর জন্য।
বাংলাদেশের মতো মুসলিম দেশগুলোর জন্য প্রশ্নটা খুব সোজা হওয়া উচিত। ভবিষ্যৎ কোথায় যাচ্ছে।
আমরা কেন দুই কোটি টাকা খরচ করে আন্ডারগ্র্যাজুয়েশন করতে কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ায় যাব, যেখানে চায়নায় একই বা কাছাকাছি র্যাংকের ইউনিভার্সিটিতে খরচ তার এক-তৃতীয়াংশ।
কেন আমরা ভাষার ভয় দেখাব, যখন এআইয়ের যুগে ভাষা আর বাধা না। ইংরেজি যেমন শিখেছি জীবনের প্রয়োজনে, তাহলে চায়নিজ শিখতে সমস্যা কোথায়।
চায়না কাউকে বলে না খ্রিস্টান হও, লিবারাল হও, বা নিজের কালচার বদলাও। তারা বলে, এসো, কাজ করো, ব্যবসা করো। এই মডেলটাই মুসলমানদের বোঝা দরকার।
ওয়েস্ট গত কয়েকশ বছর ধরে কলোনাইজ করছে কালচার দিয়ে, ফাইন্যান্স দিয়ে, যুদ্ধ দিয়ে।
চায়না সেই জায়গায় একটা ভিন্ন টেমপ্লেট দিচ্ছে। সেই টেমপ্লেট ফলো করলে মুসলিম দেশগুলোও জেনারেশনাল ইমপ্রুভমেন্ট আনতে পারে। এটা আবেগ না, এটা হিসাব।
ইতিহাসে মুসলমানরা কখনো অন্যদের অন্ধভাবে অনুসরণ করেনি; তারা দেখেছে, শিখেছে, আর নিজেদের মতো করে প্রয়োগ করেছে। আজ চীনের উত্থান সেই শেখার জায়গাটাই সামনে আনে।