22/08/2026
পন্ডিত শ্রীনাথ চন্দ্র ( গোপালপুর, টাঙ্গাইল)
সাংবাদিক, সংস্কারক ও শিক্ষক
শ্রীনাথ চন্দ্র ছিলেন সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সমাজসংস্কারক এবং ব্রাহ্মসমাজের নেতা। তিনি ময়মনসিংহ ও বৃহত্তর টাঙ্গাইল অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে তিনি নিজেকে একজন বিশিষ্ট মনীষী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
শ্রীনাথ চন্দ ১৮৫১ সালের ১ এপ্রিল টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর থানার ফুলবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন জগন্নাথ চন্দ।
দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ায় শ্রীনাথের শৈশব কেটেছে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। জীবিকার প্রয়োজনে তাঁর পিতা নিজ গ্রাম ছেড়ে বড়বাজু পরগণার বাঙ্গড়া গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেই বাঙ্গড়া গ্রামেই শ্রীনাথের শিক্ষাজীবনের সূচনা।
মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি গ্রামের পণ্ডিত গোলকচন্দ্র সেনের কাছে বিদ্যারম্ভ করেন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে অসাধারণ মেধা ও শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহের পরিচয় পাওয়া যায়। পরবর্তীতে তিনি পাথরাইল গ্রামের বাংলা স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। এক বছরের মধ্যে ‘শিশুশিক্ষা তৃতীয় ভাগ’, ‘বোধোদয়’ ও ‘চরিত্রাবলী’ শেষ করে তিনি চারুপাঠের শ্রেণিতে প্রবেশ করেন। পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির পড়াশোনা শেষ করে তিনি ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
১৮৬৫ সালে শ্রীনাথ ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে মাসিক দুই টাকা বৃত্তি লাভ করেন। এরপর জ্ঞাতি ভাই হরচন্দ্রের আশ্রয়ে তিনি ময়মনসিংহের হার্ডিঞ্জ স্কুলে ভর্তি হন। পরের বছর, ১৮৬৬ সালে তিনি চার টাকা বৃত্তি লাভ করে নর্মাল ট্রেনিং স্কুলে ভর্তি হন। শিক্ষকতা পেশায় দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি সেখানে নিষ্ঠার সঙ্গে অধ্যয়ন করেন।
১৮৬৯ সালে নর্মাল স্কুলের চূড়ান্ত পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। তাঁর এই সাফল্য প্রমাণ করে যে সীমাহীন দারিদ্র্যও তাঁর জ্ঞানার্জনের আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
শিক্ষাজীবনের এই সময়েই তাঁর চিন্তাজগতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ১৮৬৯ সালে তিনি তাঁর সতীর্থ কৃষ্ণকুমার মিত্রের সঙ্গে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ব্রাহ্মধর্মের উদারনৈতিক ও সংস্কারবাদী আদর্শ তাঁর জীবন ও কর্মে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। কুসংস্কার, সামাজিক বৈষম্য ও পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে তিনি সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৮৭০ সালে শ্রীনাথ চন্দ ময়মনসিংহ জেলা স্কুলে হেড পণ্ডিত হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সমাজসংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে বিধবা বিবাহ, নারীশিক্ষা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংস্কারের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে তিনি অন্যান্য তরুণ সংস্কারক ও ব্রাহ্মসমাজের কর্মীদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। নারীশিক্ষার প্রসার এবং সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
শুধু শিক্ষকতা নয়, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও শ্রীনাথ চন্দ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৮৮০ সালে তিনি ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকা, ‘ময়মনসিংহ সভা’ এবং ‘সারস্বত সমিতি’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন। এসব প্রতিষ্ঠান ও প্রকাশনার মাধ্যমে তিনি সমাজের শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের মধ্যে জ্ঞানচর্চা, সাহিত্যচর্চা, সামাজিক সংস্কার ও দেশীয় চেতনা জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল নিছক সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজের অসংগতি তুলে ধরা এবং মানুষকে সচেতন করাই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
১৮৯৭ সালে বাংলায় সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে শ্রীনাথ চন্দ মানবিক সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশ নেন। বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ তাঁর সমাজসেবামূলক মানসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সমাজের কল্যাণকে তিনি নিজের ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সমগ্র বাংলায় যে স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ার সৃষ্টি হয়, শ্রীনাথ চন্দও তাতে যোগ দেন। দেশীয় পণ্য ব্যবহার, জাতীয় চেতনা জাগ্রত করা এবং ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশী ভাবধারার প্রসারে তিনি ভূমিকা রাখেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর সমাজসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী চেতনারও সমন্বয় ঘটে।
দীর্ঘ কর্মময় জীবনের পর ১৯০৬ সালে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তবে অবসর গ্রহণের পরও তাঁর সাহিত্য ও চিন্তাচর্চা থেমে যায়নি।
তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ ‘ভারত মিলন’ এবং স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘ব্রাহ্মসমাজে চল্লিশ বছর’। তাঁর লেখায় সমাজ, ধর্ম, দেশ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
শ্রীনাথ চন্দের জীবন ছিল সংগ্রাম, শিক্ষা, সমাজসেবা ও আদর্শনিষ্ঠার এক অনন্য সমন্বয়।
১৯৩৮ সালের ২৩ জুলাই এই গুণী ব্যক্তিত্ব মৃত্যুবরণ করেন। সমাজসংস্কার ও মানবকল্যাণে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।
(তাঁরা আমাদেরও
ভয়েস অফ কাজল)