21/09/2026
বিয়ের সময় দেওয়া উপহার সামগ্রী কি ডিভোর্সের পর ফেরত পাওয়া যায়?
প্রিয় পাঠক,
এটি বিচ্ছেদ বা ডিভোর্সের পর উভয় পক্ষের (স্বামী ও স্ত্রী) মধ্যেই তৈরি হওয়া অন্যতম এক বড় আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। বিয়ের সময় উভয় পক্ষ থেকে দেওয়া সোনাদানা, গয়না, আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক্স পণ্য বা অন্যান্য উপহারসামগ্রী কে পাবেন বা এগুলো ফেরত দাবি করা যায় কি না- তা নিয়ে আদালতে বহু মামলা ঝুলন্ত রয়েছে।
আইনের স্পষ্ট জবাব হলো, হ্যাঁ, বিয়ের সময় যৌতুক ছাড়া সাধারণ উপহার হিসেবে দেওয়া জিনিসপত্র (বিশেষ করে স্ত্রীর নিজস্ব অলংকার ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র) ডিভোর্সের পর ফেরত পাওয়া এবং তা আদায়ের পূর্ণ আইনি অধিকার রয়েছে।
চলুন, বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।
বিয়ের উপহার ও মালামাল ফেরত: আইনি নিয়ম ও ক্যাটাগরি-
আইনের চোখে বিয়ের সময় আদান-প্রদান হওয়া উপহারগুলোকে ৩টি মূল ভাগে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা হয়:
১. স্ত্রীর অলংকার ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য উপহার (স্ত্রীধন)
বিয়ের সময় কনেকে তার বাপের বাড়ি থেকে দেওয়া সোনার গয়না, জামাকাপড়, উপহার কিংবা শ্বশুড়বাড়ির পক্ষ থেকে স্ত্রীকে সরাসরি উপহার দেওয়া অলংকার, আইনের চোখে স্ত্রীর নিজস্ব ব্যক্তিগত সম্পত্তি (স্ত্রীধন)।
আইনি অবস্থান: ডিভোর্স হয়ে গেলে সাবেক স্বামী বা তার পরিবারের লোকেরা কোনোভাবেই স্ত্রীর এই সোনাদানা বা ব্যবহার্য জিনিস আটকে রাখতে পারবে না। এগুলো সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীকে ফেরত দিতে তারা বাধ্য।
আদায়ের পথ: স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোক যদি গয়না বা জিনিসপত্র ফেরত দিতে অস্বীকার করে বা আত্মসাৎ করে, তবে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করার পাশাপাশি দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারা অনুযায়ী ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ (Criminal Breach of Trust) এবং ৪২০ ধারায় প্রতারণার মামলা করতে পারেন।
২. আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক্স ও ঘর সাজানোর জিনিস (Fittings & Furniture)
বিয়ের সময় কনের পরিবার থেকে নতুন সংসার সাজানোর জন্য যে খাট, সোফা, ফ্রিজ, টিভি ইত্যাদি দেওয়া হয়, ডিভোর্সের পর কনে বা তার পরিবার সেগুলো ফেরত দাবি করতে পারেন।
ক্যাটাগরি: এগুলো যদি সাধারণ উপহার বা পারস্পরিক সৌহার্দ্যের উপহার হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তার তালিকা বা ক্রয়ের রসিদ প্রদর্শন করে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে তা ফেরত পাওয়া সম্ভব।
যৌতুক হিসেবে দিলে: তবে এই জিনিসগুলো যদি স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে দাবি করে বা জোরপূর্বক ‘যৌতুক’ (Dowry) হিসেবে নেওয়া হয়ে থাকে, তবে স্ত্রী ‘যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮’-এর ৩ ধারা অনুযায়ী স্বামী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা করে সাজা প্রদান ও জিনিসপত্র পুনরুদ্ধার করতে পারেন।
৩. বরকে দেওয়া উপহার বা উপহারের আদান-প্রদান (Husband's Gifts)
বিয়ের সময় কনেপক্ষ থেকে বরকে যে উপহার (যেমন: ঘড়ি, স্যুট, মোটরসাইকেল ইত্যাদি) দেওয়া হয়, অথবা বরপক্ষ থেকে যে উপহার দেওয়া হয়েছিল:
চুক্তি আইন (Contract Act) এবং মুসলিম আইন অনুযায়ী, যে উপহার একবার স্বেচ্ছায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং যা ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়ে গেছে, সাধারণভাবে সেই প্রথাগত উপহার আর ফেরত চাওয়া যায় না।
তবে বর যদি যৌতুক হিসেবে কোনো বাইক বা গাড়ি দাবি করে নিয়ে থাকে, তবে কনেপক্ষ তা আইনের মাধ্যমে ফেরত আদায়ের পাশাপাশি আইনি শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারে।
উপহার ও মালামাল সহজে ফেরত পাওয়ার ২ টি ব্যবহারিক উপায়
১. বিয়ের সময় মালামালের তালিকা তৈরি রাখা: বিয়ের সময় কোন পক্ষ কী কী উপহার দিচ্ছে, তার একটি লিখিত তালিকা করে উভয় পক্ষের সই নিয়ে রাখা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। এটি পরবর্তীতে আদালতে অলংকার বা আসবাবপত্র ফেরতের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
2. পারস্পরিক সমঝোতা: ডিভোর্সের সময় উভয় পক্ষ যদি একসাথে বসে দেনমোহর ও খোরপোশের পাশাপাশি সোনাদানা ও আসবাবপত্র প্রত্যর্পণের হিসাব লিখিতভাবে সমাধান করে নেন, তবে বছরের পর বছর আর আদালতে ঘুরতে হয় না।
সহজ কথায়, বিয়ের উপহারের নামে স্ত্রীর দেনমোহর বা গয়নাকাপড় আটকে রাখা অন্যায় ও বেআইনি। বিচ্ছেদের পর স্ত্রীর নিজস্ব অলংকার ও ব্যবহার্য আসবাবপত্র ফেরত দেওয়া স্বামীর আইনি বাধ্যবাধকতা।
আইন জানুন, আইনি সচেতনতার মাধ্যমে আপনার সম্মান ও অধিকার বজায় রাখুন।
পোস্টটি শেয়ার করুন, তাতে আপনার কাছের মানুষজন সচেতন হবেন, উপকৃত হবেন। এ ছাড়া, এ ধরণের পোস্ট শেয়ারের মাধ্যেমে আপনি আপনার অবস্থানকেও শক্তিশালী করতে পারবেন।
পারিবারিক আইনসহ দাম্পত্য, পরকীয়া, বিবাহ বিচ্ছেদ, দেনমোহর, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাকত্ব ও হেফাজত, নারীর অধিকার এবং অন্যান্য আইনসংক্রান্ত নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট পেতে আমাদের পেজটি Follow করুন।
আপনার কোন প্রশ্ন থাকলে হোয়াটসঅ্যাপে +8801715747777 এই নম্বরে মেসেজ লিখুন। আপনার নাম পরিচয়ের গোপনীয়তা রক্ষা করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কপিরাইট সংক্রান্ত তথ্য: লেখাগুলো আমার প্রকাশিতব্য আইন-সচেতনতার বিভিন্ন বই থেকে নেয়া। সেই ধারাবাহিকতায় কিছু কিছু অংশ প্রকাশিত হচ্ছে। কপি-পেস্ট করলে লেখকের নাম, পরিচয় ও বইয়ের নামসহ করবেন।
অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল
এলএলএম, এমবিএ, এমএ, ডিসিএপি
আইনজীবী, লেখক, ফ্যামিলি কনসালটেন্ট
সাবেক আইন ও কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ [রবি আজিয়াটা পিএলসি]
সাবেক ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালটেন্ট [বেক্সিমকো গ্রুপ]
01715747777, 01641000008
#ফ্যামিলিকনসালটেন্ট #আইনসহায়িকা #বিয়েরউপহার