20/12/2023
#আইনের_চোখে_অশ্লীলতা
নিজ প্রয়োজনে জানতে হবে...
বাংলাদেশ সহ ভারত উপমহাদেশের আইন ব্যবস্থা এবং লিখিত আইন প্রক্রিয়া এসেছে ব্রিটিশদের হাত ধরে । এর পূর্বের আইন ব্যবস্থা নির্ভর ছিল ধর্মীয় অনুশাসনের উপর সুতরাং অশ্লীলতা এর শাস্তি ব্যবস্থা ধর্মীয় আইন-কানুনের উপর ভিত্তি করে এক এক সমাজ ব্যবস্থা এক এক রকম শাস্তি প্রদান করতেন। ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম অশ্লীলতাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবৈধ বা অপরাধ মূলক কার্য বলে গণ্য করা হয় পেনাল কোড ১৮৬০ ধারা ২৯১-২৯৪ এর মাধ্যমে এবং কালের ক্রমে এবং সময়ের চাহিদায় বাংলাদেশে এই বিষয়ে আরও আইন তৈরি করা হয় যেমন: বাংলােদশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন , ২০০১, পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন , ২০১২।
অশ্লীলতার বিপক্ষে বাংলাদেশ সহ ভারত উপমহাদেশে প্রথম যে আইনে উল্লেখ করা হয় তা হলো পেনাল কোড ১৮৬০ ধারা ২৯১-২৯৪। অন্যতম হলো ধারা ২৯৪ এখানে অশ্লীল কাজ ও গান সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে বলা হয়েছে:
ধারা ২৯৪। ।
যে ব্যক্তি, অন্যদের বিরক্ত সৃষ্টি করে :
ক) কোন প্রকাশ্য স্থানে কোন অশ্লীল কার্য করে অথবা
খ) কোন প্রকাশ্য স্থানে বা প্রকাশস্থানে সন্নিকটে কোন অশ্লীল গানের গাঁথা, সংগীত বা পদাবলী গায়, আবৃত্তি করে বা উচ্চারণ করে
সে ব্যক্তি যে কোন বর্ণনার সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে যার মেয়াদ তিন মাস পর্যন্ত হতে পারে অথবা জরিমানা দন্ডে বা উভয় দন্ডে দণ্ডিত হবে।
কালের পরিবর্তে প্রচারণা প্রক্রিয়ার পরিবর্তন হয়েছে । মানুষ সামাজিক মাধ্যম বা ইন্টারনেটকে প্রচারণা বড় মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। সুতরাং সময়ের দাবিতে প্রচারণা মাধ্যমের উপর ভিত্তি বাংলােদশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন , ২০০১ এ টেলিযোগাযোগ ব্যবহার করে অশ্লীল প্রচার এবং এ শাস্তি বিষয়ে বলা হয়েছে।
এখানে বলা হয়েছে:
ধারা ৬৯৷।
যদি-
(ক) কোন ব্যক্তি টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি বা বেতার যন্ত্রপাতির সাহায্যে কোন অশ্লীল, ভীতি প্রদর্শনমূলক বা গুরুতরভাবে অপমানকর কোন বার্তা প্রেরণের উদ্দেশ্যে উক্ত যন্ত্রপাতির পরিচালন কাজে নিয়োজিত ব্যক্তির নিকট প্রস্তাব করেন, বা
(খ)উক্ত প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে দ্বিতীয়োক্ত ব্যক্তি সজ্ঞানে বা ইচ্ছাকৃতভাবে উক্তবার্তা প্রেরণ করেন, বা
(গ) কোন ব্যক্তি চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি বা বেতার যন্ত্রপাতির সাহায্যে অন্য কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের নিকট অশ্লীল, গুরুতরভাবে অপমানকর, হুমকিমূলক কোন বার্তা বা অন্যকোন ভীতিকর বার্তা বা কোন কথোপকথন বা ছবি বা ছায়াছবি প্রেরণ করেন, তাহা হইলে দফা (ক) এর ক্ষেত্রে প্রস্তাবকারী এবং দফা (খ) এর ক্ষেত্রে প্রস্তাবকারী ও প্রেরণকারীর এই কাজ হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য উক্ত প্রস্তাবকারী বা, প্রেরণকারী বা, ক্ষেত্রমত, উভয়ে অনধিক ২ (দুই) বৎসর কারাদন্ডে বা অনধিক ৫ (পাঁচ) কোটি টাকা অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং দফা (গ) এর ক্ষেত্রে প্রেরণকারী অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদন্ডে বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে এবং অনাদায়ে ০৩ (তিন) মাসের কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন।]
অতঃপর সময়ের দাবিতে অশ্লীলতাকে রোধের জন্য এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন , ২০১২ প্রণয়ন করা হয়। যেখানে পর্নোগ্রাফিকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হয়। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ এর ধারা ২(গ) এ অশ্লীলতাকে পর্নোগ্রাফি এর সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
যেখানে বলা হয়েছে:
ধারা ২(গ)||
‘‘পর্নোগ্রাফি’’ অর্থ—
(১) যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কোন অশ্লীল সংলাপ, অভিনয়, অঙ্গভঙ্গি, নগ্ন বা অর্ধনগ্ন নৃত্য যাহা চলচ্চিত্র, ভিডিও চিত্র, অডিও ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থির চিত্র, গ্রাফিকস বা অন্য কোন উপায়ে ধারণকৃত ও প্রদর্শনযোগ্য এবং যাহার কোন শৈল্পিক বা শিক্ষাগত মূল্য নেই;
(২) যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী অশ্লীল বই, সাময়িকী, ভাস্কর্য, কল্পমূর্তি, মূর্তি, কাটুর্ন বা লিফলেট;
(৩) উপ-দফা (১) বা (২) এ বর্ণিত বিষয়াদির নেগেটিভ ও সফট বার্সন;
এরি সাথে এ আইনে পর্নোগ্রাফি সম্পর্কিত বিভিন্ন অপরাধের কারণে বিভিন্ন কঠোর শাস্তির উল্লেখ করা হয়েছে ।
#প্রশ্ন_হতে_পারে_অশ্লীলতা_কি_বা_এর_মানদণ্ডই_বা_কি?
সময়ের সাথে অশ্লীলতার ব্যাখ্যা পরিবর্তন হয়। একেক সমাজ একেক ভাবে এই অশ্লীলতাকে ব্যাখ্যা করে। দুঃখজনক হলেও সত্যি আমাদের দেশে অশ্লীলতা কে ব্যাখ্যা করে এমন সু নির্দিষ্ট কোন আইনি সংজ্ঞা নেই। কিন্তু বোঝার সুবিধার্থে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের উদাহরণ হিসেবে আনতে পারি । যেখানে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অশ্লীলতাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।
(রণজিত ডি উদেশী বনাম মহারাষ্ট্র সরকার) মামলায় ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯২ ধারার সাংবিধানিক বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিলো। সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য সেটাকে নাকচ করে। এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের মত যে, অশ্লীলতা শব্দটি মোটেই অস্পষ্ট নয়।
(১) এটি অনুভূতিপ্রবণ মনকে কলুষিত করে ও নৈতিক অধঃপতন ঘটায়;
(২) এটি নোংরা ও লাম্পট্য চিন্তা মাথায় আনে;
(৩) এটা অকৃত্রিম পর্নোগ্রাফি;
(৪) এটি কাম উদ্রেককারী;
(৫) এটি যৌন-বিষয়ক কুচিন্তা মনের মধ্যে আনে;
(৬) সমাজিক ভাবে গ্রাহ্য যে সীমারেখা – তা ছাড়িয়ে যায়।
যদিও এই রায় আমাদের বাংলাদেশীদের উপর বাধ্যবাধকতার সৃষ্টি করে না কিন্তু এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি আইন কিভাবে অশ্লীলতাকে ব্যাখ্যা করে।
#আমাদের_সতর্কতা_কেন_প্রয়োজন?
বেশ কিছু সময় ধরে সোশ্যাল মিডিয়া যেমন ফেসবুক, ইউটিউব, টিক টক, এসবের মাধ্যমে কনটেন্ট এর নামে অশ্লীলতাকে প্রচার করা হচ্ছে। যেখানে স্বাধীনতার নামে নগ্নতা, গালাগাল বা পর্নোগ্রাফির প্রচারনা হচ্ছে।
এই বিষয়টিকে আমরা দুই ভাবে বিবেচনা করতে পারি। প্রথমত নিজের সংস্কৃতি এবং সামাজিক মূল্যবোধকে অক্ষুন্ন রাখতে, দ্বিতীয়ত নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে আইনের লঙ্ঘন থেকে রক্ষার জন্য।
আমরা যারা ইন্দো-আর্য সভ্যতা তাদের সামাজিক কাঠামো পশ্চিমা সভ্যতার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। আমাদের কাছে শালীনতা একটি সংবেদনশীল বিষয়। সুতরাং এর ভঙ্গন যেমন আমাদের নীতি নৈতিকতা এবং সংস্কৃতি এর বিরুদ্ধে তেমনি রাষ্ট্রীয় আইনের লঙ্ঘন।
আইনের একটি নীতি আছে ( ignorantia juris non excusat- “ignorance of law excuses no one” যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় “আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা কোনো অজুহাত হতে পারে না” ।
রাষ্ট্র যখন একটি আইন তৈরি করে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব সে আইন সম্পর্কে অবগত থাকা এবং মেনে চলা। মানুষ অনুকরণ প্রিয় সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা অন্যদের অনুকরণ করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই নিজের দেশের আইনকে লঙ্ঘন করছি এবং যখনই এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা গ্রহণ করে তখন আমরা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে বা রাষ্ট্রকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে তোলি। অবশ্য এটাও সত্য , অনেক ক্ষেত্রেই আইনের অপব্যবহার দেখা যায় সুতরাং এসব বিষয়ে সতর্ক থাকার বিকল্প নেই।
#আইনের_ব্যবহার:
স্যোশাল মিডিয়ায় বা সরাসরি কারো এমন কোনো কার্যক্রম যা উপরোক্ত আলোচনায় অশ্লীলতার আওতাভুক্ত হয় এবং তা আমাদের কারো বিরক্তি এর কারণ হয়ে উঠে তাহলে সে প্রমাণ সহকারে ( স্ক্রিনশট, ছবি, ভিডিও) উপরোক্ত আইনের উল্লেখ করে নিকটবর্তী থানায় একটি জিডি অথবা এজাহার করতে পারে।
Key words : Obscene acts, অশ্লীলতা, দন্ড বিধি, আইন, পরামর্শ
যেকোনো আইনি পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন
ARC
Website: www.myarc.pw
Email: [email protected]
Facebook: https://www.facebook.com/myarc.fb?mibextid=ZbWKwL