06/05/2026
একটি অপরাধ মানেই পুরো একটি প্রতিষ্ঠান, জাতি, ধর্ম বা সম্প্রদায়কে দোষারোপ—এই মুনাফেকি মানসিকতা বন্ধ করা দরকার।
মাদ্রাসায় সেটা ছেলেদের হোক অথবা মেয়েদের হোক, কোনো অপরাধ ঘটলে সবাই হঠাৎ “সব মাদ্রাসা বন্ধ” বলার দাবি তোলে। ভাবখান এমন যেন, সেটা বন্ধ করলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।
কিন্তু সাধারণ জেনারেল স্কুল বা কলেজে যখন শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষন, নগ্ন ছবি বা ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলিং বা যৌন নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসে, তখন কি কেউ বলে “সব স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দাও” বা “মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করো”? অথবা মন্দিরের পুরোহিত, ধর্মগুরু দ্বারা যৌন নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসে তখন কি আমরা বলি সেগুলো বন্ধ করে দাও! না, তখন আমরা বলি—অপরাধীর বিচার হোক, সিস্টেম ঠিক হোক।
এই দ্বিমুখী অবস্থান কেন? হয়তো এর মাধ্যমে ইস্লামোফোবিক জনগণ তাদের ন্যারেটিভ, প্রপোগ্যান্ডা বাস্তবায়ন করতে কাজ শুরু করে। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই পূর্বধারণা, ভয় বা পক্ষপাত কাজ করে—যার ফলে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়কে সহজেই টার্গেট করা হয়। আবার অনেক সময় মানুষ আবেগের বশে বা মিডিয়ার প্রভাবেও একপাক্ষিক প্রতিক্রিয়া দেখায়।
কিন্তু যেটাই কারণ হোক, নীতি একটাই হওয়া উচিত—অপরাধী ব্যক্তি, কোনো প্রতিষ্ঠান বা পুরো সম্প্রদায় নয়। মাদ্রাসা হোক বা স্কুল-কলেজ—যেখানেই অপরাধ ঘটুক, সেখানে জবাবদিহিতা, নিরাপত্তা ও কঠোর বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচিত ক্ষোভ নয়—সব ক্ষেত্রে সমানভাবে ন্যায়বিচার দাবি করাই সত্যিকার ন্যায়ের পথ। সেক্ষেত্রে অপরাধী যে-ই হোক—মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ বা অন্য কোথাও—তার কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোতে জবাবদিহিতা, নিরাপত্তা ও তদারকি বাড়াতে হবে। কিন্তু কোনো একক ঘটনার জন্য পুরো একটি শিক্ষাব্যবস্থা বা সম্প্রদায়কে দোষারোপ করা শুধু অন্যায়ই নয়, সমস্যার সমাধানও না।
আমাদের অবস্থান একটাই হওয়া উচিত—ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো, অপরাধীর শাস্তি যত দ্রুত সম্ভব নিশ্চিত করা, আর সব প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা। নির্বাচিত ক্ষোভ নয়, ন্যায়বিচারের প্রতি সমান প্রতিশ্রুতি দরকার।
আইনগতভাবে দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী-
" যদি কোন ব্যক্তি বিবাহ বন্ধন ব্যতীত, ষোল (১৬) বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন করিয়া বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া,
অথবা ষোল (১৬) বৎসরের কম বয়সের কোন শিশুর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌনকর্ম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।
যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন। উল্লেখ্য যে ধর্ষণ” অর্থে বলাৎকারও অন্তর্ভুক্ত হইবে"
নেত্রকোনার ১১ বছরের এক শিশুর গর্ভবতী হওয়ার খবর আমাদের সবাইকে নাড়া দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এটা কোনো “বিতর্কের বিষয়” না—এটা স্পষ্টভাবে একটি গুরুতর অপরাধ।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর সাথে যেকোনো যৌন সম্পর্ক—সে সম্মতি দিক বা না দিক—ধর্ষণ হিসেবে গণ্য। তাই এখানে কোনো দ্বিধা নেই: অপরাধ হয়েছে, এবং সঠিক তদন্তের পর বিচারিক আদলতে অপরাধীর কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে।
আমাদের অবস্থান পরিষ্কার হওয়া উচিত—
ভুক্তভোগী শিশুটির নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
অপরাধী যে-ই হোক, তার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে হবে।
এবং যেখানে এই ঘটনা ঘটেছে, সেখানে জবাবদিহিতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্ত করতে হবে।
কোনো ধর্ম, প্রতিষ্ঠান বা পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে অপরাধ ঢাকার চেষ্টা যেমন অন্যায়, তেমনি কোনো একটি ঘটনাকে অজুহাত করে পুরো একটি গোষ্ঠীকে দোষারোপ করাও অন্যায়।
ন্যায়বিচার মানে একটাই—সবার জন্য একই মানদণ্ড। নির্বাচিত ক্ষোভ নয়, সত্যিকারের ন্যায়বিচার চাই। সেটা এপ্সটিন ফাইলে থাকা চিন্নিত পেডোফাইল, রেপিস্ট বিলিয়নিয়ার থেকে শুরু করে ভবঘুরে মানুষ যে কেউ। পুরোহিত, ইমাম থেকে শুরু করে ঘরের পিতা মাতা যে কেউ। মনে রাখতে হবে—অপরাধীর কোনো ধর্ম, বর্ণ, জাত বা রঙ নেই। একজন খারাপ মানুষ যেকোনো পরিবার, যেকোনো সমাজ, যেকোনো বিশ্বাস থেকে আসতে পারে। তাই অপরাধকে ব্যক্তি হিসেবে বিচার করতে হবে, কোনো পরিচয়ের আড়ালে নয়।