12/05/2026
“প্রতিটি কাজই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল”।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা শর্তসাপেক্ষে সকল ব্যবসা ও পেশাকে বৈধ করেছেন।
শর্ত হচ্ছে তাতে হারাম, মিথ্য, প্রতারণা ধোঁকা ইত্যাদি থাকা যাবে না। ইসলামী শরিয়তে ওকালতি পেশাকে হারাম বা নাজায়েজ করা হয়নি।
হানাফি মাজহাবে সর্বজনস্বীকৃত ও প্রসিদ্ধ প্রামাণ্যগ্রন্থ আদ্ দুররুল মুখতারে আছে ,
التَّوْكِيلُ صَحِيحٌ بِالْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ، قَالَ تَعَالَى {فَابْعَثُوا أَحَدَكُمْ بِوَرِقِكُمْ} [الكهف: 19] «- وَوَكَّلَ - عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ - حَكِيمَ بْنَ حِزَامٍ بِشِرَاءِ أُضْحِيَّةٍ» ، وَعَلَيْهِ الْإِجْمَاعُ،
অর্থাৎ, ওকিল নিযুক্ত করা কুরআন-সুন্নাহ সমর্থিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা এই মুদ্রাগুলো দিয়ে একজনকে পাঠাও।-(সুরা কাহাফ-19)।
রাসূলুল্লাহ (স.) হাকিম ইবনে হিজাম (রা.)-কে কুরবানীর পশু ক্রয়ের জন্য ওকিল নিযুক্ত করেছিলেণ। আর এর ওপরই উম্মতের ইজমা। (মাকতাবা শামেলা) এর থেকে বুঝা যায় অন্যন্য পেশার ন্যায় মৌলিকভাবে ওকালতির পেশাও বৈধ। তবে তার জন্য বেশ কিছু শর্ত রয়েছে।
(১) ওকালতির লক্ষ্য হবে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা এবং মিথ্যাকে প্রতিহত করা, মজলুমকে সাহায্য করা এবং অধিকার বঞ্চিতদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা
(২) প্রতারণামূলক মামলা গ্রহন না করা:
এ ধরনের মামলার লক্ষ্য হলো মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ওপর প্রতিশোধ নেয়া হয়, তার ক্ষতিসাধন করা হয় এবং দুর্নাম ছড়ানো হয়। আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালা এ ধরনের কাজের ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন-
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
আর যেসব লোক মুমিন পুরুষ ও নারীদের বিনা অপরাধে কষ্ট দেয়, তারা একটা মস্তবড় মিথ্যা অপবাদ ও সুস্পষ্ট গোনাহের বোঝা নিজেদের মাথায় চাপিয়ে নিয়েছে। (আল আহযাব ৫৮)।
(৩) কুখ্যাত অপরাধীর পক্ষে ওকালতি না করা: যারা কুখ্যাত, অত্যাচারী এবং অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত তাদের পক্ষে ওকালতি করতে ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। কারণ তাদের পক্ষে ওকালতি করা অর্থ অত্যাচার, অন্যায়-নিপীড়নের পক্ষে কাজ করা। তাই এসব কর্মকান্ড পরিহার করে মানুষকে সৎ পরামর্শ দানের মাধ্যমে সচেতন করে তোলাই একজন আইনজীবীর অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য।
(৪) অন্যায়ের বিপক্ষে ওকালতি জারি রাখা: মামলা পর্যবেক্ষণ করার পর যদি কোনো আইনজীবীর কাছে এটা পরিষ্কার হয় যে, তার মক্কেল সত্য/ন্যায়ের ওপর নেই এবং যদি সে দোষী প্রমাণিত হয়, তবে সে আইনজীবীর উচিত মক্কেলের প্রতি তার আচরণ পরিবর্তন করা। তাকে বোঝানো এবং সৎ পরামর্শ দেয়া যাতে সে তার প্রতিপক্ষকে সঠিক পথে অনতিবিলম্বে ক্ষতিপূরণ আদায় করে। এটা যেকোনো পেশাদার আইনজীবীর জন্য গ্লানিকর যে, তিনি তার মক্কেলের মিথ্যা মামলা পরিচালনা করবেন এই ভেবে যে, এটা তার দায়িত্ব যেকোনোভাবে মামলায় মক্কেলকে জিতিয়ে দেয়া। শায়খ আবু যাহরা, বিশিষ্ট ইসলামী পন্ডিত, সাধারণ মামলা-মোকদ্দমার ব্যাপারে অভিমত প্রকাশ করেন যে, যদি তার মক্কেল দোষী হয় তবে তার এমন মক্কেলের পক্ষে ওকালতি করা উচিত হবে না।
(৫) সুদ এবং মাদক সংক্রান্ত মামলায় ওকালতি না করা: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা মুসলমানদের জন্য সব ধরনের বেআইনি অর্থ উপার্জন নিষিদ্ধ করেছেন, যেমন-সুদ, মাদক বেচা-কেনা, ঘুষ ইত্যাদি। সুতরাং একজন আইনজীবী, সুদ কিংবা অবৈধ ব্যবসা সংক্রান্ত মামলায় লড়ে যাওয়ার অনুমতি পান না। কারণ, এটা এক প্রকারের অপরাধমূলক কাজকে সাহায্য করা। আল্লাহ বলেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحِلُّوا شَعَائِرَ اللَّهِ وَلَا الشَّهْرَ الْحَرَامَ وَلَا الْهَدْيَ وَلَا الْقَلَائِدَ وَلَا آمِّينَ الْبَيْتَ الْحَرَامَ يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنْ رَبِّهِمْ وَرِضْوَانًا ۚ وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَاصْطَادُوا ۚ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ أَنْ صَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَنْ تَعْتَدُوا ۘ وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
‘‘যেসব কাজ পুণ্যময় ও আল্লাহর ভয়মূলক, তাতে সবাইকে সহযোগিতা করো, আর গোনাহ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজ, তাতে কারো একবিন্দু সাহায্য ও সহযোগিতা করো না।’’ (আল-মায়েদা ২)।
তবে নিরপরাধ কাউকে ঐ ধরনের মামলায় ফাঁসানো হলে আইনজীবী তাকে মুক্ত করতে আইনী সহায়তা দিতে পারেন।
(৬) বিচারকার্যে প্রতারণার আশ্রয় না নেওয়া। বল প্রয়োগ করে অথবা অন্যায়ভাবে মধ্যস্থতা না করা:
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একজন আইনজীবী তার কাজে অবশ্যই বৈধতা ও স্বচ্ছতা অবলম্বন করবেন। ইসলাম এ বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। আইনজীবীর জন্য যেকোনো অন্যায় ও অবৈধ পন্থা অবলম্বন করা নিষিদ্ধ। মহানবী (সাঃ) বলেছেন : ‘‘যারা কোনো শাস্তি রহিত করার জন্য অনুনয় কিংবা মধ্যস্থতা করে, যা আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত সে যেন আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করে এবং জেনে-শুনে অন্যায়ভাবে কোনো মামলা চালায় সে যেন আল্লাহর ক্রোধে পতিত হলো যে পর্যন্ত সে তা পরিহার করে।’’
(৭) আল্লাহ তায়ালার দন্ডে দন্ডিত ব্যক্তির পক্ষে ওকালতি করা:
মামলা আদালতে প্রক্রিয়াধীন হলে কোনো আইনজীবী এমন কোনো ব্যক্তির মুক্তির জন্য ওকালতি করতে পারবে না যে ব্যভিচার, চুরি, মিথ্যা অভিযোগ ইত্যাদি অপরাধের কারণে শরিয়তের দৃষ্টিতে দন্ডপ্রাপ্ত হয়।
ইমাম নববী বলেছেন, ‘‘সকল ফকিহ (ইসলামিক স্কলার) একমত হয়েছেন যে, শরীয়ার দৃষ্টিতে কোনো মামলায় মক্কেল দন্ডিত হলে তার পক্ষে কোনো রকম মধ্যস্থতা নিষিদ্ধ। যাই হোক, আবার অনেক ফকিহের মতে মধ্যস্থতা অনুমতিযোগ্য, যদি এমন হয় যে, দন্ডিত ব্যক্তি সাধারণ মানুষের জন্য খুব বিপজ্জনক নয়।’’
হাদীসে বর্ণিত আছে যে,
عن عائشة رضي الله عنها أنها قالت : " كَانَتِ امْرَأَةٌ مَخْزُومِيَّةٌ تَسْتَعِيرُ الْمَتَاعَ وَتَجْحَدُهُ ، فَأَمَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ تُقْطَعَ يَدُهَا روى مسلم (1316) " .وفي رواية أخرى عن عائشة رضي الله عنها – أيضاً - : أَنَّ قُرَيْشًا أَهَمَّهُمْ شَأْنُ المَرْأَةِ المَخْزُومِيَّةِ الَّتِي سَرَقَتْ ، فَقَالُوا : وَمَنْ يُكَلِّمُ فِيهَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ؟ فَقَالُوا : وَمَنْ يَجْتَرِئُ عَلَيْهِ إِلَّا أُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ ، حِبُّ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَلَّمَهُ أُسَامَةُ ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( أَتَشْفَعُ فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ ؟! ) ، ثُمَّ قَامَ فَاخْتَطَبَ ، ثُمَّ قَالَ : ( إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ ، أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ ، وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الحَدَّ ، وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا ) (رواه البخاري 3475)
(ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ) ফাতিমা নাম্নী একজন মাখজুমি গোত্রের মহিলা, যেটি কুরাইশ বংশের নামকরা গোত্র, যে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে।
তাকে মহানবী (সাঃ)-এর সামনে নিয়ে আসা হলো। নবীজী সিদ্ধান্ত দিলেন তার হাত কেটে ফেলা হবে। কুরাইশরা তার ভাগ্যের ব্যাপারে সন্দিহান ছিল। তারা ওসামা বিন জায়েদকে প্রতিনিধি করে মহানবীর (সাঃ) নিকট পাঠালো। মহানবী (সাঃ) অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে পড়েন এবং বলেন, ‘‘(হে ওসামা) তুমি কি এমন কারো মধ্যস্থতা করতে চাও যাকে আল্লাহ শাস্তি দিয়েছেন? আল্লাহর শপথ, যদি ফাতিমা নবী কন্যাও চুরিতে ধরা পড়তো, আমি তার হাত কেটে ফেলার আদেশ দিতাম।’’ এমন কারো জন্য মধ্যস্থতা কিংবা ওকালতি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ যে শরীয়ার দৃষ্টিতে দন্ডপ্রাপ্ত, এ হাদীসটি এর পক্ষে একটি শক্তিশালী দলিল।
রাসূল (সাঃ) আরো বলেন, যে ব্যক্তি অন্যায়ের পক্ষ অবলম্বন করে তার ওপর আল্লাহর ক্রোধ ও অভিসম্পাত বর্ষিত হয়। (মুসনাদে আহমদ ও আবু দাউদ) ওকালতি পেশাকে সমাজের কাছে আরো অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্যে মিথ্যা ও ছল-চাতুরী পরিহার করে এটাকে আরো সুনিপুণ ও কৌশলপূর্ণ করে তোলা শ্রেয়।
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ ۚ وَلَا تَكُنْ لِلْخَائِنِينَ خَصِيمًا
নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফায়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান। আপনি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হবেন না। (নিসা ১০৫)
তাছাড়া ‘ওকালতি’ পেশায় নিজের ঈমানী মজবুতী পরীক্ষারও সুযোগ রয়েছে। এখানে সততার সাথে টিকে থাকা সর্বোত্তম জিহাদ সমতুল্য হতে পারে।
সততার সাথে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইনজীবীর আইন পেশা হালাল তথা ইবাদত সমতুল্য। তবে হক হালালী বজায় না রাখলে সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করলে আইন পেশা কেন, যে কোনো পেশাই হারামে পরিণত হবে। এ ব্যাপারে কারো কোনো সন্দেহ নেই।
উল্লেখ্য নিজের উপর যদি কেউ অস্থাশীল হয় এবং যুগসচেতন কোনো হক্কানী আলেমের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে সততার সাথে ইবাদত মনে করে এই পেশায় আত্মনিয়োগ করে তাহলে সময়ের প্রেক্ষাপটে দেশ, জাতি এবং মুসলিম মিল্লাতের অনেক বড় উপকার হবে ইনশাআল্লাহ।
কিন্তু তা না করে যদি নিছক এটাকে পেশা এবং অর্থ উপার্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহন করে তাহলে তাকে আল্লাহ তায়ালার এই সতর্কবাণী স্মরণ রাখতে হবে, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সুরা নুরের ২৪ নং আয়াতে উল্লেখ করেন,
يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
(স্মরণ করে সেই দিনের কথা) যেদিন তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও পা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে তারা যা করত।
-