25/06/2026
মতলব উদ্ঘাটিত হইয়া গেলে অনেক আয়োজনই ভেস্তে যায়। স্বার্থের এই জগতে টিকে থাকিবার সংগ্রাম নিতান্ত সহজ নহে। এখানে মানুষ মানুষকে অতিক্রম করিয়া অগ্রসর হইতে চাহে; একে অপরকে পশ্চাতে ফেলিয়া সাফল্যের শিখরে আরোহণ করিতে চাহে। আর সেই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হইবার এক সুপ্রাচীন কৌশল হইল—প্রতিপক্ষকে ধোঁকায় রাখা। ধোঁকা মূলত তাহাই, যাহা নহে তাহাকে তাহাই বলিয়া প্রতিপন্ন করা; গিল্টি সোনাকে খাঁটি সোনা বলিয়া গ্রহণ করাইয়া লওয়া।
দেশে ছিনতাই ও ডাকাতির প্রকোপ বৃদ্ধি পাইবার পর বাজার গিল্টি সোনার অলঙ্কারে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। এই সকল অলঙ্কার বাহ্যিক রূপে প্রকৃত স্বর্ণালঙ্কারের ন্যায়ই দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। দুর্বৃত্তেরা অতর্কিতে গৃহে প্রবেশ করিয়া অস্ত্রের মুখে পরিবারবর্গকে জিম্মি করিয়া আলমারি ও সিন্দুক ভাঙিয়া বহু যত্নে সঞ্চিত স্বর্ণালঙ্কার, হীরা-মুক্তাখচিত গহনা লুণ্ঠন করিয়া লইয়া গেলে গৃহিণীদের হৃদয়ে যে বেদনার সৃষ্টি হয়, তাহা সহজে উপশম হইবার নহে। মনোবিজ্ঞানীগণ যখন তাহাদের মানসিক ক্ষত সারাইবার প্রয়াসে নিয়োজিত হন, তখন অন্যদিকে গিল্টি অলঙ্কার প্রস্তুতকারকরাও যেন এক অভিনব সান্ত্বনার পসরা সাজাইয়া উপস্থিত হন। তাহাদের নির্মিত অলঙ্কারগুলি রূপে, বর্ণে ও সৌন্দর্যে এমনই মনোহর যে, প্রথম দর্শনে আসল ও নকলের ভেদরেখা নির্ণয় করা দুষ্কর হইয়া পড়ে।
প্রথমদিকে অনেকেই এই অলঙ্কারের প্রতি অনাগ্রহ প্রদর্শন করিলেও তরুণীসমাজ দ্রুত তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়ে। পরবর্তীকালে কন্যাদের অনুকরণে মাতারাও সেই ধারায় শামিল হন। আজ গিল্টি অলঙ্কার মা ও মেয়ের সমান প্রিয়। ফলে অলঙ্কার ছিনতাইয়ের পুরাতন হিসাব-নিকাশেও একপ্রকার পরিবর্তন ঘটিয়াছে।
জীবনসংগ্রামে টিকে থাকিতে হইলে মানুষকে নানাবিধ কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করিতে হয়। প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করিবার প্রবণতাও তাহারই একটি বহিঃপ্রকাশ। প্রকৃতপক্ষে প্রতিপক্ষ না থাকিলে প্রতারণারও প্রয়োজন থাকিত না। কিন্তু প্রতিপক্ষ আছে—এবং তাহার অস্তিত্ব অত্যন্ত বাস্তব। সে গৃহে আছে, সমাজে আছে; জলে আছে, স্থলে আছে; শৈশব হইতে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনের সর্বত্র তাহার বিচরণ।
অনেকে বলিয়া থাকেন, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল উৎস সম্পত্তি। কিন্তু সম্পত্তি কেবল অর্থ, ধন-সম্পদ কিংবা ভোগ্যবস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে। মনোবল, আত্মবিশ্বাস, প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও চরিত্রও এক একটি অমূল্য সম্পদ। অনেক সময় বিপুল ধনসম্পদের অধিকারী ব্যক্তি এমন একজনের নিকট পরাভূত হন, যাহার একমাত্র পুঁজি তাহার অদম্য মানসিক শক্তি ও দৃঢ় প্রত্যয়।
কারণ অর্থ-বিত্তের চাকচিক্য অনেকাংশে গিল্টি সোনার ন্যায়। কালের আবর্তে তাহার ঔজ্জ্বল্য ম্লান হইয়া যায়, রং ফিকে হইয়া পড়ে। কিন্তু সত্য, সততা, চরিত্র ও মনোবলের দীপ্তি খাঁটি সোনার ন্যায়; সময়ের স্পর্শে তাহা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। বরং যুগের পর যুগ অতিক্রান্ত হইলেও তাহার জ্যোতি অম্লান থাকে, তাহার মহিমা চিরভাস্বর রহিয়া যায়।
জীবনেরও একটি হিসাবের খাতা রহিয়াছে। সেখানে আয়-ব্যয়ের অঙ্ক কেবল অর্থের দ্বারা নির্ধারিত হয় না। মানুষ সারাজীবন যাহা সঞ্চয় করে, তাহার মধ্যে ধনসম্পদের স্থান হয়তো দৃশ্যমান; কিন্তু চরিত্র, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিকতার সঞ্চয় অধিক মূল্যবান। বাহ্যিক সাফল্যের চাকচিক্যে অনেক সময় মানুষ নিজেকে লাভবান বলিয়া মনে করে, অথচ জীবনের প্রকৃত খাতায় তাহার হিসাব থাকে ঘাটতির।
অপরদিকে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাহাদের ঘরে অর্থের প্রাচুর্য নাই, কিন্তু সত্যভাষণ, ন্যায়নিষ্ঠা, আত্মমর্যাদা ও সৎকর্মের পুঁজি তাঁহাদের সমৃদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়াইয়া যখন মানুষ আপন হিসাবের খাতা খুলিয়া দেখে, তখন সে উপলব্ধি করে—কত সম্পদ অর্জন করিলাম, তাহার চেয়ে বড় প্রশ্ন হইল, কেমন মানুষ হইয়া উঠিলাম।
পার্থিব জগতের অনেক হিসাবই কৌশলে গোপন করা যায়, অনেক প্রতারণাই সাময়িকভাবে সফল হইয়া উঠে। কিন্তু জীবনের চূড়ান্ত হিসাবের খাতায় গিল্টি সোনা খাঁটি সোনা বলিয়া গৃহীত হয় না। সেখানে মুখোশের মূল্য নাই, বাহ্যিক চাকচিক্যেরও স্থায়িত্ব নাই। সেখানে গ্রহণযোগ্য হয় কেবল খাঁটি স্বর্ণের ন্যায় নির্মল চরিত্র, বিশুদ্ধ বিবেক এবং সত্যের প্রতি অবিচল আনুগত্য।
অতএব জীবনের প্রকৃত প্রজ্ঞা এইখানেই—মানুষ যেন গিল্টির মোহে বিভ্রান্ত না হইয়া খাঁটি সোনা হওয়ার সাধনা করে; কারণ দিনের শেষে সকলকেই নিজের জীবনের হিসাবের খাতা মিলাইতে হয়।
(বি.দ্র. ২০২১ সালের এই লেখাটি ঈষৎ মার্জিত ও সংযোজিত)
_______
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম
চট্টগ্রাম
২৫.০৬.২০২৬ খ্রি. \ বৃহস্পতিবার।