14/02/2026
“ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৩–পরবর্তী সিআইবি কাঠামো: দায়বদ্ধতা, অযোগ্যতা, পরিচালক ও জামিনদারের অবস্থান এবং প্রতিকারব্যবস্থা”
ভূমিকা: ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো সিআইবি ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ঋণখেলাপি কমানো এবং ব্যাংকিং খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। সময়ের সঙ্গে সিআইবি বাংলাদেশের ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে পরিণত হয়েছে।
ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৩ সিআইবি কাঠামোকে আরও কঠোর ও স্পষ্ট করেছে। এতে খেলাপির শ্রেণিবিভাগ, ব্যাংকের বাধ্যতামূলক রিপোর্টিং, পরিচালক ও জামিনদারের ব্যক্তিগত দায়, প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক অযোগ্যতা এবং প্রতিকারব্যবস্থা সুসংহতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
১. সিআইবি’র প্রকৃতি ও কার্যকারিতা: সিআইবি একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস, যেখানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের ঋণসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে। কোনো ঋণ অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সিআইবি রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হয়। এতে প্রতিফলিত হয়—
• মোট দায়
• কিস্তি পরিশোধের ইতিহাস
• খেলাপি অবস্থা
• অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ঋণ এক্সপোজার
এই পূর্ব-পর্যালোচনা পদ্ধতি ঋণ বিতরণের ঝুঁকি কমায়, প্রক্রিয়ার সময় সংক্ষিপ্ত করে এবং পরবর্তী খেলাপির হার হ্রাস করে।
২. খেলাপির আইনগত শ্রেণিবিভাগ: সংশোধিত আইনে দুই ধরনের খেলাপি নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক. সাধারণ ঋণখেলাপি
ধারা ৫ (গগ) অনুযায়ী, কোনো ঋণ বা আর্থিক সুবিধা ছয় মাস বা তার বেশি সময় বকেয়া থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হিসেবে গণ্য হবে। সাধারণত ব্যবসায়িক ক্ষতি, আর্থিক সংকট বা অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির কারণে এমন খেলাপি ঘটে।
খ. ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি
ধারা ৫ (কককক) অনুযায়ী, নিম্নলিখিত অবস্থায় একজনকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ধরা হবে—
• পরিশোধের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা
• নিজের বা প্রতিষ্ঠানের জন্য নেওয়া ঋণ ইচ্ছাকৃতভাবে ফেরত না দেওয়া
• জালিয়াতি, প্রতারণা বা ভুয়া তথ্য দিয়ে ঋণ গ্রহণ করা
ইচ্ছাকৃত খেলাপির ক্ষেত্রে নৈতিক ও আইনগত কঠোরতা বেশি।
৩. ব্যাংকের বাধ্যতামূলক রিপোর্টিং ও জরিমানা: ধারা ২৭খা অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে খেলাপির তালিকা বাধ্যতামূলকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রেরণ করতে হবে।
নির্ধারিত সময়ে তালিকা না পাঠালে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৫০ লাখ টাকা থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা আরোপ করা যেতে পারে।
তবে আইন একই সঙ্গে সতর্ক করেছে যে, নাম প্রেরণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ভুল বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারও নাম অন্তর্ভুক্ত করলে তা ব্যবসা ও সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকেরও দায়িত্ব তথ্য যাচাই করে চূড়ান্ত অন্তর্ভুক্তি করা।
৪. অন্তর্ভুক্তির ব্যাপ্তি: খেলাপি প্রতিষ্ঠানের—
• সকল পরিচালক
• ন্যূনতম ২০ শতাংশ শেয়ারধারী
• ঋণের জামিনদার
সবার নাম সিআইবি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
জামিনদারের অবস্থান
ঋণ খেলাপি হলে জামিনদার আইনত খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন। তবে তিনি নিম্নোক্ত সুরক্ষা ভোগ করেন—
• অন্তর্ভুক্তির আগে ব্যক্তিগত শুনানির অধিকার
• ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের অধিকার
• আদালতে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ
• ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে অব্যাহতির সুযোগ
৫. সিআইবি তালিকাভুক্তির ফলাফল:
ক. নির্বাচনী অযোগ্যতা
প্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ অনুযায়ী ঋণখেলাপি ব্যক্তি সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হতে পারবেন না। স্থানীয় সরকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী মেয়র, কাউন্সিলর বা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হিসেবেও অযোগ্য হবেন। দায়িত্বে থাকলে পদ শূন্য ঘোষণা হতে পারে।
খ. বাণিজ্য সংগঠন
এফবিসিসিআই সহ বিভিন্ন ট্রেড বডির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ।
গ. ব্যাংকের পরিচালক পদ
ধারা ২৭খা (৮) অনুযায়ী, কোনো পরিচালক খেলাপি তালিকাভুক্ত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তার পদ শূন্য ঘোষণা করবে।
ধারা ২৭খা (৭) অনুযায়ী, তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পরও পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে পারবেন না।
ঘ. নতুন ঋণ সুবিধা
খেলাপিকে সাধারণত নতুন ঋণ সুবিধা দেওয়া যাবে না। তবে ২০২৩ সংশোধনের ফলে একই গ্রুপের অন্য অখেলাপি প্রতিষ্ঠান ঋণ পেতে পারে।
ঙ. ভ্রমণ ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা
ধারা ২৭খা (৬) অনুযায়ী—
• বিদেশ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা
• ট্রেড লাইসেন্স সীমাবদ্ধতা
• শেয়ার ক্রয় নিষেধাজ্ঞা
• নতুন কোম্পানি নিবন্ধনে বাধা
এসব আরোপ করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই; তালিকাভুক্ত থাকা পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে।
৬. প্রতিকার ও প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা:
১. শুনানির অধিকার
তালিকাভুক্তির আগে ব্যক্তিগত শুনানি বাধ্যতামূলক।
২. প্রশাসনিক আপিল
• ৭ দিনের মধ্যে নোটিশ
• ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে আপিল
• বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত প্রশাসনিকভাবে চূড়ান্ত
৩. বিচারিক প্রতিকার
ভুল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে আদালতে প্রতিকার চাওয়া যাবে।
৭. ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন: পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি ও কিস্তি সমন্বয় করা যায়। এতে ছয় মাসের বকেয়া অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আগেই সমাধান সম্ভব।
পুনর্গঠনের মাধ্যমে ঋণের কাঠামো পরিবর্তন করা যায়, যেমন ওভারড্রাফটকে টার্ম লোনে রূপান্তর। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাস্টার সার্কুলার অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে খেলাপি তালিকা এড়ানো বা অব্যাহতি পাওয়া সম্ভব।
৮. তালিকা থেকে অব্যাহতি: অব্যাহতির উপায়—
• পূর্ণ পরিশোধ
• অনুমোদিত পুনঃতফসিল
• সফল আপিল
• আদালতের আদেশ
তবে ব্যাংক পরিচালক হওয়ার পাঁচ বছরের অযোগ্যতা অব্যাহত থাকতে পারে।
উপসংহার
ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৩–পরবর্তী সিআইবি কাঠামো একদিকে আর্থিক শৃঙ্খলা কঠোর করেছে, অন্যদিকে প্রক্রিয়াগত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছে।
ব্যাংকের জন্য রিপোর্টিং বাধ্যতামূলক ও জরিমানাযোগ্য করা হয়েছে। পরিচালক ও জামিনদারদের ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শুনানি, আপিল ও আদালতের প্রতিকারব্যবস্থা সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
অতএব, সিআইবি তালিকাভুক্তি শুধু একটি প্রশাসনিক রেকর্ড নয়; এটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। তাই তথ্য প্রেরণে সতর্কতা এবং অধিকার প্রয়োগে সচেতনতা—দুইই সমান গুরুত্বপূর্ণ।