16/04/2026
পুলিশ অভিযোগ না নিলে পরবর্তী করণীয় — কোথায় ও কীভাবে জানাবেন?
আমরা এমন এক দেশে বাস করি, যেখানে আজও অভিযোগের ঝুড়ি ভরা, অথচ অনেক সময় থানার দরজায় দাঁড়িয়ে মানুষ শুনতে হয় “এই মামলা আমরা নিতে পারব না।” একবিংশ শতাব্দীতেও এমন কথা শোনা যায়, যা কেবল হতাশাজনকই নয়, বরং আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এটা আমরা নানা সময়ে দেখেছি , কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায়, কখনো ক্ষমতাবান কিংবা তথাকথিত বড়লোক বা নেতাদের নির্দেশে পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু এই “অভিযোগ না নেওয়া” বিষয়টি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি একটি গুরুতর অপরাধ।
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি, পুলিশ রেগুলেশন্স ১৯৪৩ বেঙ্গল (PRB) এবং উচ্চ আদালতের একাধিক রায় অনুযায়ী, কোনো ধর্তব্য অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ মামলা নিতে বাধ্য। বাংলাদেশে প্রতিটি থানার বাইরে যে সিটিজেনস চার্টার টাঙানো থাকে, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে , কীভাবে মামলা দায়ের করতে হয়, পুলিশের ভূমিকা কী এবং যদি থানা অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে নাগরিক কী প্রতিকার পাবেন।
অপরাধের তথ্য পাওয়ার পর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এফআইআর (প্রাথমিক তথ্য বিবরণী) দায়ের ও তদন্ত শুরু করতে আইনগতভাবে বাধ্য। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারা অনুযায়ী, যদি কেউ কোনো ধর্তব্য অপরাধের তথ্য থানায় দেন, তাহলে ওসি তা লিখে নেবেন, তথ্যদাতার স্বাক্ষর নেবেন এবং যা লিখেছেন তা পড়ে শোনাবেন। এরপর সেটি নির্দিষ্ট খাতায় সংরক্ষণ করবেন। এই প্রক্রিয়াই এফআইআর বা প্রাথমিক তথ্য বিবরণী হিসেবে গণ্য হয়।
এখানে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ আদালতও বলেছেন, এফআইআর দায়েরের কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। এমনকি টেলিফোনে কেউ ধর্তব্য অপরাধের অভিযোগ জানালে এবং পুলিশ কর্মকর্তা সেটি লিখে নিলে, সেটিও এফআইআর হিসেবে গণ্য হবে এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করতে বাধ্য।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ধর্তব্য অপরাধ বলতে আসলে কী বোঝায়? ফৌজদারি কার্যবিধির দ্বিতীয় তফসিলে বলা আছে. চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণসহ বড় ধরনের যেকোনো অপরাধই ধর্তব্য অপরাধ। পুলিশ রেগুলেশন্স বেঙ্গল-১৯৪৩ (PRB)-এর ২৪৪ নম্বর প্রবিধানে বলা হয়েছে, কোনো অপরাধ আপাতদৃষ্টিতে সত্য মনে হোক বা মিথ্যা, গুরুতর হোক বা মামুলি- যদি তা দণ্ডবিধি বা কোনো বিশেষ বা স্থানীয় আইনে শাস্তিযোগ্য হয়, তবে পুলিশ বাধ্যতামূলকভাবে অভিযোগ রেকর্ড করবে। এই প্রবিধানে “shall” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ বাধ্যবাধকতা। অর্থাৎ পুলিশ এখানে কোনো বিকল্প সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
থানায় মামলা না নেওয়ার কারণে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। পুলিশ আইন, ১৮৬১ সালের ২৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়ম অমান্য করেন, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেন বা শৈথিল্য দেখান, তাহলে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা যেতে পারে। যদি তিনি অপরাধী প্রমাণিত হন, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা তিন মাসের বেতনের সমপরিমাণ জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে।
আইনের এই বিধান মামলার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া রোধের মতো অপরাধকে শাস্তিযোগ্য করে, যাতে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা আইনের অপব্যবহার করতে না পারেন। এখানে “নিয়ম বা রেগুলেশন লঙ্ঘন” বলতে মূলত PRB-এর ২৪৪ নম্বর প্রবিধানের লঙ্ঘনকেই বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ থানায় পুলিশ মামলা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে এবং তা প্রমাণিত হলে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে এই শাস্তি ভোগ করতে হবে।
আমাদের না জানার কারণেই অনেক সময় আমরা ন্যায়বিচারের নাগাল পাই না। অথচ জানা থাকলে আমরা নিজের অধিকার নিজেরাই রক্ষা করতে পারি।
প্রত্যেক নাগরিকের জানা উচিত, পুলিশ যদি কখনো মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন কীভাবে, কোথায় এবং কার কাছে অভিযোগ জানাতে হয়। ন্যায়বিচার কোনো দান নয়- এটি আমাদের সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষার শুরু হয় - নিজের কণ্ঠ থামিয়ে না রেখে, আইন জানার মধ্য দিয়েই।
চলুন জেনে নেই , পুলিশ যদি কখনো মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায় পরবর্তী করণীয় - কোথায় ও কীভাবে জানাবেন?
● পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকার করলে পিটিশন দাখিলের বিস্তারিত প্রক্রিয়া:
যদি পুলিশ কোনো অভিযোগ নিতে অস্বীকার করে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আপনি কয়েকটি ধাপে ব্যবস্থা নিতে পারেন। নিচে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হলো:
১. প্রয়োজনীয় নথি ও প্রমাণাদি প্রস্তুত
• পিটিশনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল নথি, প্রমাণাদি, ছবি, ভিডিও, চিকিৎসা প্রতিবেদন, সাক্ষীদের তথ্য সংগ্রহ করুন।
• অভিযোগের ঘটনার তারিখ, সময়, স্থান ও বিস্তারিত বিবরণ লিখে রাখুন।
এটি পরবর্তীতে থানায়, আদালত বা মানবাধিকার সংস্থায় উপস্থাপন করা হবে।
২. থানায় লিখিতভাবে আবেদন
যখন থানার অফিসার অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন তাদের কাছে লিখিত আবেদন করুন।
আবেদনটি পরিষ্কার ও সাবলীল ভাষায় লিখুন:
• আপনার নাম, ঠিকানা
• ঘটনার তারিখ, সময় ও স্থান
• ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা
থানার অফিসিয়াল রেকর্ডে (রসিদ, দারখাস্ত রেজিস্ট্রি বই) আপনার আবেদন নথিভুক্ত হবে।
যদি পুলিশ পুনরায় অজুহাত দেয়, লিখিতভাবে অস্বীকারের কারণ চাইতে পারেন। এটি পরবর্তী সময়ে প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগবে।
৩. ঊর্ধ্বতন পুলিশ কতৃপক্ষের নিকট আবেদন
থানার কর্মকর্তা যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেন, তাহলে উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার নিকট আবেদন করুন:
• জেলার পুলিশ সুপার (SP)
• ডিবি ও বিভাগীয় পুলিশ অফিস
• পুলিশ কমিশনার বা মহাপরিদর্শক (IGP), বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা
IGP কমপ্লেইন সেল:
• ফোন: 01769693535 / 01769693536
• ই-মেইল: [email protected]
অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার সময় লিখিত আবেদন ও প্রমাণাদি সংযুক্ত রাখুন এবং লিখিত প্রতিক্রিয়া দাবি করুন।
৪. ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে “আর্জি” দাখিল
যদি পুলিশ উচ্চ ও মধ্যপদস্থ কর্তৃপক্ষেও ব্যবস্থা না নেন, আইনানুগভাবে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি অভিযোগ (আর্জি) দাখিল করা যায়।
প্রয়োজনে একজন দক্ষ আইনজীবীর সহায়তা নিন। যিনি আপনাকে মামলা দায়ের করতে সাহায্য করবেন।
এখানে অভিযোগ দায়ের করলে আদালত সেই অভিযোগ মূল্যায়ন করে পুলিশকে FIR রূপে গ্রহণ, তদন্ত বা প্রতিবেদন দাখিল আদেশ দিতে পারেন।
এ ধরনের মামলা সাধারণত “নালিশি মামলা” নামে পরিচিত।
আবেদন দাখিলের সময় অবশ্যই প্রমাণ, সাক্ষীর তথ্য ও ঘটনার ধারাবিবরণ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
যদি আদালত আবেদন গ্রহণ না করে বা খারিজ করে, সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে দায়রা জজ আদালতে রিভিশন করা যায়।
৫. জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও স্বাধীন সংস্থায় অভিযোগ:
মানবাধিকার সংস্থার ভূমিকা
মানবাধিকার সংস্থাগুলি আইনি সহায়তা, পরামর্শ, তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সংস্থা এই ধরনের সহায়তা প্রদান করে।
অভিযোগ দাখিলের ধাপ
• অভিযোগ প্রস্তুত করা: লিখিত অভিযোগে সমস্যার বিস্তারিত বিবরণ, সময়, স্থান, ঘটনার বর্ণনা উল্লেখ করুন। প্রমাণাদি সংরক্ষণ করুন (ছবি, ভিডিও, চিকিৎসা প্রতিবেদন, সাক্ষ্য)।
• উপযুক্ত সংস্থা নির্বাচন : মানবাধিকার সংস্থার তালিকা প্রস্তুত করুন। সমস্যা নির্দিষ্ট বিষয়কেন্দ্রিক হলে বিশেষায়িত সংস্থা বেছে নিন।
• অভিযোগ দাখিল: ডাকযোগে: অফিসে অভিযোগ পাঠিয়ে প্রাপ্তি রশিদ সংগ্রহ করুন। ই-মেইল: সংস্থার ই-মেইল ঠিকানায় স্ক্যান কপি পাঠান। অনলাইনে: সংস্থার অনলাইন পোর্টালে অভিযোগ দাখিল করুন। ফোনে যোগাযোগ করুন, অভিযোগের অবস্থা জানতে পারেন। প্রয়োজনে সংস্থার সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন।
নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার সংস্থার নামঃ
• BLAST (Bangladesh Legal Aid and Services Trust)
ঠিকানা: সরদার ভবন, ৩য় তলা, ৩৭/২ পুরানা পল্টন, ঢাকা ১০০০
ইমেইল: [email protected]
• অধিকার (Odhikar)
ঠিকানা: ৪/২/এ, বারিধারা মসজিদ লেন, দক্ষিণ বারিধারা, ঢাকা ১২১২
ইমেইল: [email protected]
• BMBS (Bangladesh Human Rights Implementation Society)
ঠিকানা: ২৭/১১, টিপু সুলতান রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০
ইমেইল: [email protected]
• MHRCF (Manobadhikar Sangskriti Foundation)
ঠিকানা: ৪৮/১, পান্থপথ, ঢাকা ১২০৫
ইমেইল: [email protected]
৬. জনমত গঠন ও গণমাধ্যম ব্যবহার-
• অনলাইন সংবাদ মাধ্যম
নিউজ পোর্টাল: অভিযোগের বিবরণ পাঠান এবং প্রকাশের অনুরোধ করুন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম: ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করে জনসমর্থন আদায় করুন।
• প্রেস কনফারেন্সঃ সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ দিয়ে অভিযোগ তুলে ধরুন। ভিডিও বিবৃতি রেকর্ড করে সংবাদমাধ্যমে পাঠান। এটি সবচেয়ে কার্যকরী ।
সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করার সময়:
• প্রমাণ সংগ্রহ: আপনার অভিযোগের সাথে প্রমাণাদি সংযুক্ত করুন যাতে আপনার অভিযোগটি বিশ্বাসযোগ্য হয়।
• সততা ও স্পষ্টতা: আপনার অভিযোগে সততা ও স্পষ্টতা বজায় রাখুন। অভিযোগের তথ্যগুলো সঠিক ও নির্ভুল হওয়া জরুরি।
• আইনি পরামর্শ: সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ জানানোর আগে আইনি পরামর্শ নিন যেন আপনার পদক্ষেপগুলি আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক হয়।
গণমাধ্যমে অভিযোগ জানানোর মাধ্যমে আপনি আপনার অধিকার সুরক্ষিত করতে এবং ন্যায়বিচার পেতে সহায়ক হতে পারেন।
৭. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ব্যবহার;
• অনলাইন পোর্টাল ও হেল্পলাইন: পুলিশের অনলাইন পোর্টাল এবং হেল্পলাইন নম্বর ব্যবহার করুন। এটি দ্রুত এবং সহজভাবে আপনার অভিযোগ দাখিলের উপায় হতে পারে।
• অবিচার রুখতে জনসচেতনতা জরুরি:
আপনার অভিজ্ঞতা সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ পোর্টাল অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক, টুইটার) তুলে ধরুন। সাংবাদিকদের বরাবর চিঠি লিখুন, সংবাদ প্রকাশের দাবী করুন। সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা আপনার ঘটনার অনুসন্ধানমূলক রিপোর্ট তৈরি করতে পারেন। প্রচারণা ও জনদাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে
৮. গুরুত্বপূর্ণ কিছু শতর্কতা:-
• সব ধাপে নথিপত্র সংরক্ষণ করুন (লিখিত আবেদন, রসিদ, কপি)
• প্রমাণ যত ভালো ও স্পষ্ট হবে, বিষয়টি প্রতিষ্ঠা সহজ হবে
• আইনজীবীর পরামর্শ নিন, বিশেষ করে আদালতে মামলা করার প্রক্রিয়া ও সময়সীমা সম্পর্কিত
• মিথ্যা অভিযোগ এড়ান -এটি আইনি বিপদ সৃষ্টি করতে পারে
• সময়সীমা মিস করবেন না
উপসংহার:
যদি পুলিশ আপনার অভিযোগ না নেন, হতাশ হবেন না। আইন, সংবিধান এবং মানবাধিকার সংস্থা আপনার পাশে আছে। সুসংগঠিতভাবে প্রতিকার দাবি করুন, সাহস হারাবেন না এবং ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসুন। অপরাধ রুখতে এবং ন্যায়ের পথে দাঁড়াতে আজই পদক্ষেপ নিন।