01/05/2026
কখনো কখনো আদালতে বাদীর উকিল সাহেবরা বলেন, "আসামি বাদীকে সৌদি আরবের ভিসা দিবে বলেছিল, বাদী আসামির সেই কথা বিশ্বাস করে আসামিকে টাকা দিয়েছিল, আসামি কথা রাখেনি, ভিসা দেয়নি, আসামি বাদীর সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করে বিশ্বাস ভঙ্গের অপরাধ করেছে, এভাবেই 406 ধারার জামিন অযোগ্য অপরাধ হয়ে গেছে, ফলে আসামি আইনত জামিন পেতে পারে না ।"
কিন্তু বাদীর এই বিশ্বাস সেই বিশ্বাস নয়, এই বিশ্বাস ভঙ্গ সেই বিশ্বাস ভঙ্গ নয়, যা পেনাল কোডের 406 ধারায় শাস্তিযোগ্য।
পেনাল কোডের 406 ধারায় 'অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ' নামে একটি অপরাধ আছে, যে অপরাধের সংজ্ঞা 405 ধারায় প্রদান করা হয়েছে। সম গোত্রীয় আরেকটি অপরাধ হল- প্রতারনা, যা 420 ধারায় শাস্তিযোগ্য।
420 ধারার অপরাধ জামিনযোগ্য কিন্তু 406 ধারার অপরাধ জামিন অযোগ্য। 420 ধারায় মামলা হলে আসামির আসা মাত্র জামিন হয়ে যাবে কিন্তু 406 ধারায় মামলা হলে জামিন নাই; তাই ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে টাকা পয়সার লেনদেন বিষয়ে মামলা দায়ের করার সময় মামলার আরজিতে 'ধারাঃ 406/420' লিখে আনা হয়, লাগাও উভয় ধারা, ব্যাটা যেন বাদীর টাকা না দিয়ে জামিনে যেতে না পারে।
406 ধারার অপরাধের প্রাণ হল- জিম্মা দারিত্ব; এই অপরাধের ইংরেজি নাম হল criminal breach of trust, এর বাংলা 'অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ' না করে 'অপরাধজনক জিম্মা দারিত্ব ভঙ্গ' করলে ভাল হতো, তাহলে অনেক বিভ্রান্তি এড়ানো যেত।
যখন কোন অর্থ বা সম্পত্তি আসামিকে ভোগ করতে দেয়া হয় না; জমা রাখতে, বহন করতে, মেরামত করতে, পাহারা দিতে ইত্যাদি উদ্দ্যেশ্যে দেয়া হয়; তখন তা আসামি নিজে খেয়ে ফেললে বা ভোগ করে ফেললে বা অন্য কাউকে খেয়ে ফেলতে দিলে 406 ধারার অপরাধ হয়। সংক্ষেপে বলা যায়- যখন বেড়ায় খেত খেয়ে ফেলে তখন এই অপরাধ হয়।
অন্যদিকে, 420 ধারার প্রাণ হল- প্রতারনা, এই কারনে সমাজে প্রতারক শ্রেনীর মানুষকে 'ফোর টুয়েন্টি' বলে ডাকা হয়, বলা হয় "সে একটা 420"। যখন কোন কিছুর বিনিময়ে consideration হিসেবে কোন টাকা বা সম্পত্তি দেয়া হয়, তখন তা আসামিকে ভোগ করার জন্যই দেয়া হয়, তা আসামি খেয়ে ফেললে আত্মসাতের বা অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গের অপরাধ হয় না, তবে তা লিখিত বা মৌখিক চুক্তি ভঙ্গের ঘটনা হতে পারে, যেমন:
* ভিসার জন্য কোন প্রবাসিকে বা আদম ব্যবসায়ীকে টাকা দেয়া,
* কাজের জন্য শ্রমিক বা শ্রমিকের মাঝিকে টাকা দেয়া,
* সম্পত্তির বিনিময় হিসেবে অন্য কোন সম্পত্তি বা টাকা দেয়া,
* বিক্রেতাকে মালের জন্য টাকা দেয়া,
* ক্রেতাকে বাকিতে মাল দেয়া ইত্যাদি।
এখানে আসামিকে যা দেয়া হয়েছে তা তাকে খাওয়ার জন্যই দেয়া হয়েছে, আমানত হিসেবে নয়, হেফাজতে রেখে তা ফেরত দেয়ার জন্য নয়, তা সে খেয়ে ফেললে অপরাধ হয় না। এমনকি, ফেরত দেয়ার শর্তে কোন টাকা বা ভোগ্য পণ্য ধার দিলেও তা খাওয়ার জন্যই দেয়া হয়, পরে সেই মানের সেই পরিমাণ টাকা বা খাদ্য ফেরত দেয়া হবে- এমন শর্ত থাকে, তা খেয়ে ফেললে কোন অপরাধই হয় না, কারণ খাওয়ার জন্যই তো দেয়া-নেয়া হয়েছিল; যেমন- গ্রামের মহিলারা রান্না করতে গিয়ে তেল, নুন, চাল, ডাল ইত্যাদিতে কমতি পড়লে পাশের বাড়ির মহিলা থেকে ধার নেয়। যে শর্তে সেই খাওয়ার বা ভোগ করার বা ব্যবহার করার সেই জিনিসটি দেয়া হল, সে শর্ত পূরন না করলে প্রতারনা করে সেই মাল গ্রহন করা হয়েছে কিনা সে প্রশ্ন আসতে পারে, প্রতারনার ঘটনা ঘটলেই শুধু 420 ধারার অপরাধ হতে পারে। প্রতারনা করে টাকা বা মাল আসামি নিয়েছিল কিনা, তা আসামির ইনটেনশন বা মানসিকতা থেকে বুঝা যায়, এটাকে আইনের ভাষায় initial intention of deception বলা হয়; 420 ধারার অপরাধ হতে হলে ঘটনা বা লেনদেনের শুরু থেকেই আসামির সেই অসৎ মানসিকতা থাকতে হবে [46 DLR AD 180 ]।
এখন ইনটেশন তো থাকে আসামির বুকের ভিতর- মনে, না কি মাথায়! মন মহাশয় কোথায় বাস করেন? আসামির মনে বা মাথার ভিতরে কি আছে বা ছিল তা কেমনে দেখা যাবে!! তা কিন্তু দেখতে পাওয়া যায়! আশ্চর্য! কেমনে!! তা ঘটনার সার্বিক পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও আসামির সামগ্রিক আচরনে (surrounding circumstances and subsequent conduct of the accused) ফুটে উঠে [ 48 DLR AD 100]; যেমন-
* আগামি কাল বাড়ির আম গাছে থাকা মধুর বাসা ভেঙ্গে একদম খাটি মধু দিবো বলে টাকা নেয়া কিন্তু সেই মধু আর না দেয়া, এমনকি দেখা গেল তার বাড়ির আম গাছে কোন মধুর বাসাই নাই বা সব মধু টাকা নেয়ার আগের দিন অন্য লোককে বিক্রি করে দিয়েছিল;
* কাল ফেরত দিবো বলে টাকা ধার নিয়ে পরে অস্বীকার করা ও টাকা চাইলে মাইর খাবি বলে হুমকি দেয়া;
* ভিসা দিবো বলে টাকা নেয়া ও ভিসা দেয়ার কোন চেষ্টাই না করা বা ভিসা দেয়ার মত কোন উপায় তার নাই জেনেও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে টাকা নেয়া;
* মাল বিক্রি করে দাম দিবো বলে পাইকার থেকে মাল নিয়ে খুচরা বিক্রি শেষ করেও পাইকারের পাওনা না দেয়া ও কোন যোগাযোগ না করা;
* জমি বিক্রি করবো বলে বায়না করে টাকা নেয়া ও সেই জমি গোপনে অনত্র বিক্রি করে দেয়া বা সে জমি আগেই অনত্র বিক্রির পর বায়না করা ইত্যাদি
ঘটনায় ফোর টুয়েন্টি টাইপের লোকের মনের বা মাথার ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকি চিটারকে পরিস্কার দেখা যাচ্ছে।
কিছু লেনদেন থাকতে পারে যেখানে বাদী আসামির নিকট টাকা পাওনা হলেও আসামির মোটেও কোন অপরাধ বা ফৌজদারি দায় থাকে না, তবে দেওয়ানি দায় থাকতে পারে, এগুলোকে ব্যবসায়িক লেনদেন বা দেওয়ানি প্রকৃতির দায় বলা হয়, সে টাকা দেওয়ানি প্রক্রিয়ায় আদায় যোগ্য হয়, যেমন:
* দীর্ঘ ও ধারাবাহিক ব্যবসায়িক একাধিক লেনদেনের পর হিসাব শেষে যদি আরও কিছু টাকা পাওনা থেকে যায়, তা দিতে না পারলে ও কোন তথ্য গোপন বা প্রতারনার উপাদান না থাকলে কোন অপরাধ হয় না [42 DLR AD 240, 19 BLD AD 128];
* ব্যবসায়িক পাওনা আংশিক পরিশোধ করার পর বাকি টাকা আসামির আর্থিক অসঙ্গতির জন্য দিতে ব্যর্থ হলে অপরাধ হয় না, তা একটি দেওয়ানি প্রকৃতির দায় ও দেওয়ানি প্রক্রিয়ায় প্রতিকার যোগ্য; কিন্তু সেই Part payment ই যদি হয় প্রতারনার হাতিয়ার, তা দিয়েই যদি বাকি টাকা না দেয়ার অসৎ উদ্দ্যেশ্যে মাল সরবরাহ করার জন্য বাদীকে প্ররোচিত করা হয়, তাহলে 420 এর অপরাধ হয় [46 DLR AD 180];
* আসামি বাদীর পাওনা পরিশোধে আন্তরিক, কিছু দিয়েছে ও দিচ্ছে, বাকিটা দিবে দিবে বলছে ও সময় চাচ্ছে, কোন তথ্য গোপন করছে না, বাদীকে হুমকি ধামকি দিচ্ছে না, তখন প্রতারনার উপাদান থাকে না ও কোন অপরাধ হয় না [50 DLR AD 163, 49 DLR AD 132] ইত্যাদি।
খুব খুব কম ঘটনা আছে, যেটাতে এই দুই ধারার অপরাধ একত্রে হতে পারে, যেমন: কেউ বিদেশ থেকে দেশে আসতেছে; আসার সময় অন্য প্রবাসিরা তাদের পরিবারকে এনে দেয়ার জন্য সেই লোককে কিছু খেজুর, মোবাইল, নগদ টাকা ইত্যাদি দিবে; এইসব জিনিস দেশে এসে ঠিকমত বুঝিয়ে না দিয়ে খেয়ে ফেললে 406 ধারায় আত্মসাতের অপরাধ হয়; আরেক প্রবাসি তার বাড়িতে পাঠানোর জন্য কোন জিনিস দিতে আসেনি, তবুও সে দেশে আসা লোক তার কাছে গিয়ে "তোমার বাড়ির জন্য এটা দাও, সেটা দাও" বলে খুঁজে নিয়ে আসলো এবং সব মেরে দিলো!! এই খুঁজে আনা জিনিসের ক্ষেত্রে 420 ও 406 উভয় ধারার অপরাধ একত্রে হয়েছে; প্রথমতঃ সে মেরে দেয়ার অসৎ উদ্দ্যেশ্যে মানুষকে দেশের বাড়ির জন্য কিছু জিনিস তাকে দিতে প্ররোচিত করে চিটিং করেছে, দৃতীয়তঃ সেসব জিনিস এনে তার বাড়িতে বুঝিয়ে না দিয়ে খেয়ে ফেলে 406 ধারায় আত্মসাতের অপরাধ করেছে। তবুও এই রকম নগদ টাকা খরচ করে ফেলে পরে নিজের টাকা এনে দিয়ে দিলে অপরাধ হবে না, কিন্তু খেজুর-মোবাইল ইত্যাদি হুবহু আসলটা অসৎ উদ্দ্যশ্যে অবৈধ লাভের জধ্য বদল করে ফেললেও আত্মসাতের অপরাধ হবে।
406/420 ধারার অপ প্রয়োগ অহরহ হতে দেখা যায়। অতিরিক্ত জেলা জজ হওয়ার পর ফৌজদারি আপীল-রিভিশনে দেখলাম- এমন কিছু 406/420 ধারার মামলা হয়েছে, আসামির অনেক দিন জামিন হয়নি, এমনকি সাজা হয়ে গেছে!! যেখানে আসলে কোন অপরাধই হয়নি বা 420 ধারার অপরাধ হয়েছে কিন্তু 406 ধারা অন্যায়ভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। এই দুইটি অপরাধের মর্মার্থ ও পার্থক্য বুঝার ও সঠিকভাবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে আদালত পাড়ায় কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে পাওনা টাকা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে এই দুইটি ধারাকে একত্রে বুঝে-শুনে অপ প্রয়োগের আবেদন জানানো হয়, কোন কোন আদালত সেই আবেদনে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে থাকেন, উদ্দ্যেশ্য অনেকটা সৎ ও পাওনা টাকা আদায় করে দেয়া, কিন্তু পাওনা টাকা আদায়ের অন্য আইনগত উপায় রয়েছে, পাওনা টাকা আদায়ের জন্য 406/420 ধারাকে অপ প্রয়োগ করা আইনকে ইচ্ছাকৃতভাব না মানার সামিল হয়ে যায়। সর্বদা আইন মেনে চলতে হবে, বিশেষ করে আদালতকে। আইনকে লিখিত রূপ দেয়া হয়েছে এই জন্য যে- সবাই যেন তা এক রকমভাবে মেনে চলতে বাধ্য হয়, কেউ যেন কোনটা ন্যায় বা কোনটা অন্যায় তা নিজের খাম খেয়ালের বশে ব্যাখ্যা করে যা ইচ্ছা তা করতে না পারে। প্রয়োজনে আইনকে বদলানো যেতে পারে, যেমন- পেশাদার চিটারদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য 420 কে অজামিনযোগ্য করা যেতে পারে।
দেওয়ানি রোগে আক্রান্ত মক্কেল আসলেই টেনেটুনে বা মিথ্যা গল্প সাজিয়ে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে দেয়ার একটা প্রবনতা দেখতে পাওয়া যায়। স্বামী পরিত্যাক্ত অসহায় মহিলা আদালতে এসেছেন, তার আশা নিজের ও সন্তানের মোহরানা ও ভরণপোষণ পাওয়া, কিন্তু মিথ্যা ও কল্পনার রং মেখে দায়ের করে দেয়া হল- যৌতুকের মামলা! সাথে একটি নারী-শিশু নির্যাতনের মামলা! সাথে স্বামীর বৃদ্ধ মা-বাবা ও দূরে স্বামী গৃহে বসবাসরত ননদ-ননসও আসামি! সবাইকে জেল খাটিয়ে তছনছ। রেগে গিয়ে স্বামী দিলো বাদীকে তালাক!! অনেক বছর পর বিচারে দেখা গেল- যৌতুকের কোন ব্যাপার ছিল না, অন্য কারণে সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল, মামলা খারিজ!!! তখনো ভরণপোষণ ও মোহরানা আদায়ের জন্য পারিবারিক মামলা করা হয়নি। ভরণপোষণের দাবিও তামাদি হয়ে যায়, শেষ, সব শেষ।
বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতও কোন কোন ক্ষেত্রে টাকা-পয়সা দেনা-পাওনার ঘটনায় দায়েরকৃত আইনত অচল ফৌজদারি মামলা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে দেন। বিজ্ঞ আইনজীবী ও বিজ্ঞ আদালত উভয়ের সৎ উদ্দ্যেশ্য ও আশা: এতে আসামি বাদীর পাওয়া দিয়ে দিবে। এতে বরং বাদীর ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, কারণ এমন অচল মামলা শেষ পর্যন্ত টিকবে না, অনেক বছর পর উচ্চ আদালতে গিয়ে খারিজ হয়ে যাবে, তত দিনে বাদীর দম ও টাকা আদায়ের তামাদির মেয়াদ শেষ! তাই শুরুতে আপাত নিষ্ঠুর দেখালেও আইনত অচল মামলা ফাইলিং এর সময় খারিজ করে দেয়া ও বাদীকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়া উত্তম, যেন আইনত অচল ফৌজদারি মামলা চালাতে চালাতে বাদীর দম ও পাওনা আদায়ের তামাদির মেয়াদ ফুরিয়ে না যায়।