06/10/2026
চেকের মামলা মানেই জেল নয়: কুড়িগ্রাম আদালতের একটি রায় যা শেখায়!
"চেকের মামলায় আসামীর খালাস হয় না": এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। চেকে স্বাক্ষর থাকলেই সাজা অনিবার্য, এমন বিশ্বাসে অনেক নিরপরাধ মানুষ লড়াইয়ের আগেই হাল ছেড়ে দেন। কুড়িগ্রামের দায়রা আদালতের সাম্প্রতিক একটি আপিলের রায় দেখায়, চেকটি কেন এবং কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল, তা প্রমাণ করতে পারলে আসামী খালাস পেতে পারেন।
বাদীর দাবি ছিল, তিনি ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য আসামীকে ৫ লক্ষ টাকা দেন। টাকা ফেরত না পেয়ে আসামীর দেওয়া অগ্রণী ব্যাংকের চেকটি ২৬/০৮/২০২১ তারিখে জমা দিলে তা ডিজঅনার হয়। এরপর লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে তিনি নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় মামলা করেন।
বিচারিক আদালত (যুগ্ম দায়রা জজ, ১ম আদালত, কুড়িগ্রাম) ২৮/০৫/২০২৫ তারিখে আসামীকে ১ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড দেন। আসামী এই রায়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আপিল ১১০/২০২৫ দায়ের করেন। অতিরিক্ত দায়রা জজ, ২য় আদালত, কুড়িগ্রাম আপিল মঞ্জুর করে সাজা বাতিল করেন এবং আসামীকে খালাস দেন।
১. চেকটি ছিল জামানতের, পাওনা পরিশোধের নয়।
আসামীপক্ষ দুটি চুক্তিপত্র আদালতে দাখিল করে। তাতে দেখা যায়, টাকার লেনদেন ছিল বরগুনার এক ব্যক্তি ও সিরাজগঞ্জের এক ব্যক্তির মধ্যে। আসামী ছিলেন প্রথম পক্ষের স্থানীয় জামিনদার, আর বাদী ছিলেন দ্বিতীয় পক্ষের জামিনদার ও মধ্যস্থতাকারী। চুক্তিতেই লেখা ছিল, জামিনদার হিসেবে আসামীর ৫ লক্ষ টাকার ওই চেকটি বাদীর কাছে জমা থাকবে।
২. বাদী ও আসামীর মধ্যে কোনো টাকার লেনদেন হয়নি।
আপিল আদালত সিদ্ধান্ত দেন, দুজনই কেবল জামিনদার হিসেবে যুক্ত ছিলেন, তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো লেনদেন ছিল না। বাদী নিজেও জেরায় স্বীকার করেন যে তিনি চুক্তিতে শুধু মধ্যস্থতাকারী ছিলেন এবং সেদিন চেক ছাড়া কোনো টাকা-পয়সার লেনদেন হয়নি।
৩. বাদী নিজের চুক্তিপত্রই আদালতে আনেননি।
নালিশে চুক্তির কথা উল্লেখ করলেও বাদী তা দাখিল করেননি। জবানবন্দিতে তিনি চুক্তির বিষয়বস্তু সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু বলতেও পারেননি।
৪. বিচারিক আদালত সাফাই সাক্ষ্য বিবেচনা করেননি।
আসামীপক্ষে দুজন সাক্ষী (ডি.ডব্লিউ-১ ও ২) সাক্ষ্য দেন এবং বাদীপক্ষ তাদের জেরাও করে। অথচ বিচারিক আদালতের রায়ে লেখা হয়, "আসামীপক্ষ কোনো সাক্ষ্য উপস্থাপন করেননি।" আপিল আদালত বলেন, এই সাক্ষ্য বিবেচনা করা অবশ্যই উচিত ছিল।
৫. ৩৪২ ধারার পরীক্ষায় ত্রুটি।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামীকে পরীক্ষার সময় তার বিরুদ্ধে কী কী সাক্ষ্য এসেছে, তা নির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি। আপিল আদালত একে ব্যত্যয় হিসেবে চিহ্নিত করেন।
আপিলে আরও কিছু যুক্তি তোলা হয়েছিল, যেমন লিগ্যাল নোটিশ না পাওয়া এবং ব্যাংক কর্মকর্তাকে সাক্ষী না করা। তবে খালাসের মূল ভিত্তি ছিল ওপরের বিষয়গুলো
সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা যারা চেক দেন:
ফাঁকা বা "জামানতের" চেক দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দিতেই হলে লিখিত চুক্তিতে চেকের নম্বর, টাকার অঙ্ক ও উদ্দেশ্য উল্লেখ করুন এবং চুক্তির কপি নিজের কাছে রাখুন। এই মামলায় সেই চুক্তিপত্রই আসামীকে বাঁচিয়েছে।
অন্যের লেনদেনে জামিনদার হওয়ার আগে ভালো করে ভাবুন।
মামলা হলে পালিয়ে না থেকে আদালতে হাজির হোন, সাক্ষী ও কাগজপত্র দিন।
সাজা হলে আপিলের সুযোগ আছে। তবে আপিল করতে সাধারণত চেকের অঙ্কের ৫০% জমা দিতে হয়।
চেকের পেছনে প্রকৃত পাওনা থাকতে হবে এবং তার প্রমাণ (চুক্তি, রসিদ, সাক্ষী) সংরক্ষণ করুন।
জামানত হিসেবে রাখা অন্যের চেক দিয়ে মামলা করলে তা শেষ পর্যন্ত টেকে না।
এই রায়ের অর্থ এই নয় যে ভালো আইনজীবী থাকলেই চেকের মামলায় খালাস পাওয়া যায়। ১৩৮ ধারা কঠোর আইন, এবং প্রকৃত দেনার বিপরীতে চেক দিয়ে তা ডিজঅনার হলে সাজা হওয়াই স্বাভাবিক। এখানে আসামী খালাস পেয়েছেন কারণ দলিল ও সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে যে চেকটি কোনো দেনা পরিশোধের জন্য দেওয়া হয়নি। প্রতিটি মামলার ফল তার নিজস্ব তথ্য-প্রমাণের ওপর নির্ভর করে, এবং এই রায়ের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষের উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগও রয়েছে।